ওষুধের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখাই ওষুধনীতির একমাত্র বা মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। রোগীর সামর্থ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসম্মত ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ টেকসই রাখতে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ প্রয়োজন। ‘রোগীর নাগালে ওষুধ, উৎপাদকের টেকসইতা: ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক জাতীয় নীতি সংলাপে বিশেষজ্ঞরা এ মত দিলেন।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাবলিক ইন্টিগ্রিটি নেটওয়ার্ক ফর এভিডেন্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পাইনেট) এ নীতি সংলাপের আয়োজন করে। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।
সংলাপে বক্তারা বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরি, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য মূল্য নির্ধারণ, নিয়মিত মূল্য পর্যালোচনা এবং রোগীর আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৯৯৪ সাল থেকে তালিকাভুক্ত ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণে মূলত ব্যয়ভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। নিয়মিত মূল্য সমন্বয় না হওয়া এবং ২০২২ সালের পর এসব ওষুধের মূল্য পুনর্নির্ধারণ না করায় কাঁচামাল, জ্বালানি, শ্রম, প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলেছে। এতে কম মূল্যের কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী অধ্যাপক হামিদ বলেন, ‘রোগীর জন্য ওষুধ সাশ্রয়ী রাখা এবং ওষুধ শিল্পের টেকসইতা নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী নয়। এমন মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যা রোগী বহন করতে পারেন এবং উৎপাদকও মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করতে পারেন।’ তাঁর মতে, ওষুধের কার্যকর প্রাপ্যতা শুধু কম দামের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সহজলভ্যতা, ক্রয়ক্ষমতা, গুণগত মান ও যথাযথ ব্যবহারের বিষয়ও যুক্ত। অযৌক্তিক ওষুধ ব্যবহার, প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ওষুধের ঘাটতি এবং দুর্বল আর্থিক সুরক্ষার বিষয়গুলোও সমাধান করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. মামুনুর রহমান মালিক বলেন, ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদের পাশাপাশি ওষুধের প্রাপ্যতা, ক্রয়ক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তালিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫২৩টি এবং শিশুদের জন্য প্রায় ৩৭৪টি প্রয়োজনীয় ওষুধ রয়েছে। বাজারে ওষুধ থাকলেও দুর্বল স্টক ও সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে রোগীরা বঞ্চিত হতে পারেন। তাই ড্রাগ রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।’
২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় সংক্ষিপ্ত বলে মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইডিসিএলকে শক্তিশালী করে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ উৎপাদন ও বিদেশনির্ভরতা কমানোর পরামর্শ দেন তিনি।
জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান ওষুধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও পেশাদার ও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ওষুধ কোম্পানিগুলোকে এককভাবে দায়ী না করে শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘১৯৮২ সালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ১৫০টি ওষুধ ছিল। ১৯৯৩ সালে তা বেড়ে ৭৩৯টি হলেও ১৯৯৪ সালে কমিয়ে ১১৭টি করা হয়। এরপর ২০০৮ সালে ২০৯ টি,২০১৬ সালে ২৮৫টি এবং ২০২৬ সালে ২৯৫টি ওষুধের তালিকা করা হয়। তবে আগস্টে ২৯৫টি ওষুধের তালিকা বাতিল করা হয়েছে। কেন তা বাতিল করা হলো, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’