দীর্ঘায়ু লাভের আশায় বর্তমানে একদল মানুষ এমন কিছু ওষুধের দিকে ঝুঁকছেন, যা মূলত টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি। গ্লুকাগন-লাইক পেপটাইড-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট (জিএলপি-১) নামের এই ওষুধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ‘সেমাগ্লুটাইড’ (যা ওজেম্পিক বা ওয়েগোভী নামে বাজারে পাওয়া যায়)। বর্তমানে স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিরাও এই আশায় এই ওষুধগুলো সেবন করছেন যে এগুলো তাঁদের সুস্বাস্থ্য দীর্ঘস্থায়ী করবে এবং এমনকি আয়ুও বাড়িয়ে দেবে।
আলঝেইমার, পারকিনসন, হার্ট ফেইলিওর কিংবা মদ্যপান বা মাদকাসক্তি নিরাময়ে এই ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সব থেকে বেশি উত্তেজনা কাজ করছে একটি বিশেষ ধারণাকে কেন্দ্র করে, তা হলো—এই ওষুধগুলো হয়তো বার্ধক্যের মূল কারণগুলোকে নিঃশেষ করতে সক্ষম।
বার্ধক্য প্রক্রিয়ার ওপর গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এক ডজন বা তার বেশি সুনির্দিষ্ট লক্ষণ বা ‘হলমার্ক’ চিহ্নিত করেছেন, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরের কোষ ও টিস্যুর ক্ষতি করে। প্রাথমিক গবেষণা (প্রধানত প্রাণী ও কোষ কালচারের ওপর ভিত্তি করে) ইঙ্গিত দিচ্ছে, জিএলপি-১ ওষুধগুলো এই লক্ষণগুলোর বেশ কয়েকটিকে প্রশমিত করতে পারে।
বার্ধক্য রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘ইনফ্ল্যামেজিং’ নিয়ন্ত্রণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরে একধরনের ধীরগতির কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন তৈরি হয়। জিএলপি-১ ওষুধগুলো প্রোটিন কমপ্লেক্স গঠনে বাধা দিয়ে এই প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া এগুলো কোষের ভেতরের অকেজো অংশ, যেমন ক্ষয়ে যাওয়া মাইটোকন্ড্রিয়া বা বিকৃত প্রোটিনগুলোকে পরিষ্কার বা রিসাইকেল করতে উৎসাহ দেয়। এর ফলে কোষগুলো দীর্ঘ সময় সচল থাকে। ওষুধগুলো শরীরের পুষ্টি শনাক্তের জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়াকেও নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্টেম সেলের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে, যা পুরোনো টিস্যুগুলোকে নতুন ও কার্যকর কোষ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারে।
ইঁদুরের ওপর করা একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ওষুধগুলো ‘হেলথস্প্যান’ বা সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মেয়াদ বাড়াতে সক্ষম। তবে এটি জীবনকাল বা আয়ু বাড়াতে পারে কি না, তার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া ল্যাবরেটরির প্রাথমিক কাজ আর মানুষের ওপর যথাযথ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা চিকিৎসা পরীক্ষা এক কথা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক মানুষ চিকিৎসকদের রাজি করিয়ে ‘অফ-লেবেল’ বা অনুমোদিত ব্যবহারের বাইরে গিয়ে এই ওষুধগুলো সংগ্রহ করছেন।
আপাতদৃষ্টে এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতে পারে। স্বল্পমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই ওষুধগুলো নিরাপদ হলেও দীর্ঘমেয়াদি বা সারা জীবন ব্যবহারের ফল কী হতে পারে, তা এখনো অজানা। এই ওষুধের প্রভাবে ওজন কমার পাশাপাশি শরীরের পেশির ঘনত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অনেক ব্যবহারকারী এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন এবং যেহেতু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ নেই, তাই তারা ইন্টারনেট ফোরামগুলোতে একে অপরের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং টিপস বিনিময় করছেন।
ফার্মাকোলজির প্রান্তিক পর্যায়ে এটি এখন একটি বড় ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। যেখানে মানুষ প্রথাগত চিকিৎসার বাইরে গিয়ে নিজেরাই নিজেদের ওপর অনানুষ্ঠানিক পরীক্ষা চালাচ্ছে। যাঁরা এখন রোগ প্রতিরোধের আশায় আগাম জিএলপি-১ ওষুধ নিচ্ছেন, তাঁরা কি ভবিষ্যতে এর জন্য অনুশোচনা করবেন, নাকি এর সুফল পেয়ে অনেক দিন বেঁচে থাকবেন—তা শুধু সময়ই বলতে পারবে।