শ্যাম্পুর পর মেঝেতে চুল পড়ে থাকতে দেখলে বেশির ভাগ মানুষই শ্যাম্পু বদলানোর কথা ভাবেন। হ্যাঁ, এটাই প্রথম যৌক্তিক পদক্ষেপ বলে মনে হয়। কিন্তু কখনো কখনো চুল পড়া শুধু চুলের গোড়া কিংবা শ্যাম্পুর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকে না। কখনো কখনো চুল পড়ার কারণ হতে পারে শরীরের দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগ। শরীরে পুষ্টির অভাব, হরমোনের পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কিংবা শারীরিক দুর্বলতা থাকলে চুল পড়ে যেতে পারে এবং চুলের বৃদ্ধি ধীর হয়ে বা থেমে যেতে পারে। তাই চুলের সঠিক যত্ন নেওয়ার পরও অতিরিক্ত চুল ঝরলে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
‘থাইরয়েডের সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, রক্তস্বল্পতা, অটোইমিউন রোগ, খুশকি এবং ভিটামিন ডি ও বি-১২ এর অভাবে চুল পড়তে পারে।’
ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ।
ডা. কাকলী হালদার বলেন, হঠাৎ অতিরিক্ত চুল পড়া, চুলকানি, মাথার সিঁথি চওড়া হওয়া বা গোল ছোপ হয়ে চুল উঠে যাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন পরিবর্তন, ব্রণ বা ঘন ঘন তৃষ্ণা পাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে প্রথমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসক থাইরয়েড, ব্লাড সুগার ও রক্ত পরীক্ষা করে মূল রোগটি শনাক্ত করবেন। মূল রোগ নিয়ন্ত্রণে এনে চুল ও মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখলে এবং খাদ্যে পর্যাপ্ত, ভিটামিন, প্রোটিন ও আয়রন রাখতে পারলে ঝরে যাওয়া চুল আবার স্বাভাবিকভাবে গজাতে পারে বলে জানান ডা. কাকলী হালদার।
বেশ কিছু শারীরিক অবস্থার ক্ষেত্রে চুল পড়া উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। সেগুলোর মধ্যে আছে—
‘কম সক্রিয় এবং অতি সক্রিয়—উভয় ধরনের থাইরয়েডই চুল বৃদ্ধির চক্র ব্যাহত করতে পারে। থাইরয়েড বিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে যখন এর ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন চুলের গোড়া স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সঠিক সংকেত পায় না। পাশাপাশি গোড়া দুর্বল হয়ে অতিরিক্ত চুল ঝরার কারণ হয়।’
ডা. মো. মাজহারুল হক তানিম, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
দুর্বল রক্তসঞ্চালন এবং রক্তে শর্করার ভারসাম্যহীনতা মাথার ত্বকে রক্ত প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে। এই অবস্থাগুলোর কোনোটিই শুরুতে খুব জোরালোভাবে প্রকাশ পায় না। চুল পড়া, ক্লান্তি বা ত্বকের সূক্ষ্ম পরিবর্তন প্রায়শই এর প্রাথমিক লক্ষণ হয়ে থাকে বলে জানান ডা. মো. মাজহারুল হক তানিম।
নারীদের শরীরে কিছু পরিমাণ অ্যান্ড্রোজেন হরমোন উৎপন্ন হয়। কিন্তু পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে বেড়ে যাওয়ার কারণে মাথার ত্বকে চুল পাতলা হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো শরীরের অন্য অংশে লোম বেড়ে যেতে পারে।
‘অ্যালোপেসিয়া বলতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চুল পড়ে যাওয়া বা চুলের ঘনত্ব কমে যাওয়া বোঝায়। এর বিভিন্ন ধরন রয়েছে এবং এর কারণও একেক ক্ষেত্রে একেক রকম। তাই অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক চুল পড়লে নিজে থেকে কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।’
তাওহীদা রহমান ইরিন, ওয়েলনেস কনসালট্যান্ট, রিজুভা ওয়েলনেস।
অ্যালোপেসিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলবশত চুলের গোড়া বা তার আশপাশের টিস্যুকে আক্রমণ করে। ফলে অতিরিক্ত চুল ঝরার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাওহীদা রহমান ইরিন জানান, অ্যালোপেসিয়ার চিকিৎসায় বর্তমানে পিআরপি, পিআরএফ, এক্সোসোম থেরাপিসহ বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। রোগীর চুল পড়ার ধরন ও কারণ বিবেচনা করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা উপযুক্ত ক্ষেত্রে এসব চিকিৎসার পরামর্শ দিয়ে থাকেন এবং অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়।
নিয়মিত খাবার খাওয়া সত্ত্বেও অনেকের শরীরে চুলের গোড়া বা ফলিকল যে পুষ্টির ওপর নির্ভরশীল, তার ঘাটতি থাকে। এর কারণ হতে পারে খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি, শরীরের পুষ্টি শোষণ করার ক্ষমতা না থাকা বা শরীরের চাহিদা অনুযায়ী খাবারের জোগান দিতে না পারা।
‘ভিটামিন ডি, জিংক, বায়োটিন এবং প্রোটিন হলো চুল পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সাধারণ ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম।’
ইতি খন্দকার, ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট অ্যান্ড ডায়েট কনসালট্যান্ট, আর রাহা হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকস লিমিটেড।
দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এই ঘাটতিগুলো খুব কম প্রাথমিক পর্যায়ে বোঝা যায়। রক্ত পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধরা পড়ার আগে পর্যন্ত, চুল পড়া, ভঙ্গুর নখ বা কম শক্তি হতে পারে একমাত্র লক্ষণ। চুল পড়াকে শুধু বংশগত বা মানসিক চাপের ফল বলে ধরে নেওয়ার আগে বিষয়টি মনে রাখা উচিত। তাই সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ার পরামর্শ দেন ইতি খন্দকার।
বৃদ্ধির চক্র দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শুধু মেজাজকেই প্রভাবিত করে না, এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে কর্টিসলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া চুলের গোড়াকে একটি বিশ্রাম পর্বে ঠেলে দিতে পারে। একে টেলোজেন এফ্লুভিয়াম বলা হয়। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে কোনো চাপপূর্ণ ঘটনা বা দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপের দুই থেকে তিন মাস পরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চুল ঝরে পড়ে। এই বিলম্বই বেশির ভাগ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। চুল পড়া শুরু হতে হতে, মানসিক চাপের সময়টা হয়তো শেষ হয়ে যায়, তাই এর মধ্যকার যোগসূত্রটি স্পষ্ট হয় না। এ ক্ষেত্রে চুল পড়াটা একটি বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া।
‘কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ বেড়ে গেলে তা চুলের ফলিকলে আঘাত করে। এ ছাড়া চুলের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরিতে বাধা দেয়। এর কারণে প্রচুর চুল পড়তে পারে।’
অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া, চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার
চুল পড়ার মূল কারণ যদি থাইরয়েডের সমস্যা হয়, তাহলে কোনো বাহ্যিক চিকিৎসা তা উল্লেখযোগ্যভাবে বন্ধ করতে পারবে না। যদি এটি আয়রনের অভাবে হয়, তাহলে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চুল পুনরুদ্ধার হবে না। একইভাবে চুল পড়ার কারণ যদি হরমোনজনিত, অপুষ্টিজনিত বা মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়, তাহলে প্রথমে সেই সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। এতে চুল ঝরা কমবে।