হোম > স্বাস্থ্য

দাম সমন্বয় না হলে ওষুধশিল্প টিকবে না: ঔষধ শিল্প সমিতি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বিএপিআই নেতারা। ছবি: সংগৃহীত

ডলারের দাম, কাঁচামাল, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, মান নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সে অনুযায়ী ওষুধের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে না বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বিএপিআই)। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, বিশেষ করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নিয়মিত পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা না থাকলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই আর্থিক চাপে পড়বে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের ওষুধশিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আজ সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিএপিআইয়ের কার্যালয়ে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন ওষুধশিল্পের উদ্যোক্তারা। সভায় ওষুধশিল্পের অগ্রগতি, সম্ভাবনা ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ও সমন্বয়, উৎপাদন ব্যয় এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।

বিএপিআইয়ের নেতারা বলেন, দেশে স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। তবে ডলারের বিনিময়মূল্য বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানির ব্যয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের বাড়তি খরচের সঙ্গে ওষুধের দাম সমন্বয় না হওয়ায় শিল্পটি চাপের মধ্যে পড়ছে।

সংগঠনটির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘ওষুধের দাম নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। সময়ের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় পরিবর্তিত হলেও দাম সমন্বয়ের জন্য উদ্যোক্তাদের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে বারবার আবেদন করতে হয়—এটি দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ব্যবস্থা নয়।’

জাকির হোসেন বলেন, ‘শুধু দাম বাড়লে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের দাম কমানোও হয়। ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও নিয়মিত হালনাগাদব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’ আগামী বছর ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঙ্গে ওষুধের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা করবেন উল্লেখ করেন জাকির হোসেন।

সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান এম মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘রোগের বোঝা (ডিজিজ বার্ডেন) বাড়ার সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাও নিয়মিত হালনাগাদ হওয়া প্রয়োজন। দেশে ওষুধের প্রাপ্যতা আগের তুলনায় বেড়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধের মান নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’

মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকঋণ নিয়ে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউএসএফডিএসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিভিন্ন শর্ত মেনে ওষুধ উৎপাদন করতে হয়। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সে অনুযায়ী দাম নির্ধারণের সুযোগ না থাকলে বিনিয়োগকারীদের জন্য এই খাত আকর্ষণীয় থাকবে না।’

বিএপিআই মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, ‘টিকা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ডব্লিউএইচওর ম্যাচুরিটি লেভেল-৩ (এমএল-৩) অর্জনের জন্য দেশে কাজ চলছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ সক্ষমতা অর্জন করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের টিকা রপ্তানির সুযোগ বাড়বে।’

মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, ‘ওষুধ উৎপাদনে গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) থেকে কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিসসহ (সিজিএমপি) বিভিন্ন মানদণ্ড মেনে চলতে হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে এসব মানদণ্ড ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসছে। সেগুলো অনুসরণ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয়ও বাড়ছে।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় ওষুধ উৎপাদনের ব্যয় আরও বেড়েছে বলে জানান হালিমুজ্জামান। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কারখানায় জেনারেটর ও ইউপিএস চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, ‘ওষুধশিল্পের সঙ্গে অন্যান্য শিল্পের একটি বড় পার্থক্য হলো—উৎপাদন প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে তা মাঝপথে বন্ধ করা যায় না। এতে প্রস্তুত করা ওষুধের একটি ব্যাচ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে ব্যয় বাড়ছে।’

বিএপিআই মহাসচিব বলেন, ‘ওষুধের দাম নির্ধারণে শুধু জ্বালানি ব্যয় নয়, কাঁচামাল, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সংরক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন ব্যয় বিবেচনায় নিতে হয়। আগে যেখানে গুড স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস অনুযায়ী পাঁচটি পরীক্ষা লাগত, বর্তমানে সেখানে আটটি পরীক্ষা করতে হচ্ছে। নতুন নতুন ইমপিউরিটি বা অমেধ্য শনাক্তে উচ্চমূল্যের রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার করতে গিয়ে মান নিয়ন্ত্রণের খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া ওষুধ বাজারজাতের পরও নির্দিষ্ট শেলফ লাইফ ও মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত নমুনা সংরক্ষণ করে নিয়মিত পরীক্ষা চালাতে হয়। এতে উৎপাদন-পরবর্তী ব্যয়ও বাড়ছে।’

বিএপিআই মহাসচিব আরও বলেন, ‘জ্বালানির বাড়তি ব্যয় দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা নিজেদের মুনাফা থেকে বহন করা কঠিন হবে। তখন উৎপাদন খরচ সমন্বয় করতে ওষুধের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।’

মতবিনিময় সভায় বিএপিআই নেতারা বলেন, ওষুধের কাঁচামালের বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডলারের বিনিময়মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পরিবহন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন শর্ত পূরণে ব্যয় বাড়ছে।

সভায় দেশের ওষুধশিল্পের সক্ষমতা নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন আলোচনাতেও শিল্প উদ্যোক্তারা মূল্য নির্ধারণ, কাঁচামাল আমদানি ও নিয়ন্ত্রক জটিলতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন বিএপিআই নেতারা।

মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএপিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) মো. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। এ ছাড়া সারা দেশের জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন—এমন প্রায় ৩০ জন সাংবাদিক ও বিএইচআরএফের সদস্যরা সভায় অংশ নেন।