হোম > স্বাস্থ্য

উপকূলে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা

বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী পিরোজপুরে। এ জেলার সব উপজেলায় কম-বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে। ছবি: আজকের পত্রিকা

দুই মাস ধরে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বাইরে এবার বিভিন্ন জেলাতেও ডেঙ্গু আক্রান্তের হার অনেক বেশি। এর মধ্যে খুলনা, পিরোজপুর, বরিশাল, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার ও নারায়ণগঞ্জ— এই ৯ জেলায় প্রায় ১৫ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা মোট রোগীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি।

প্রকোপ দ্রুত বাড়তে থাকা জেলাগুলোর একটি বড় অংশ উপকূলীয় এলাকায়। ডেঙ্গুর এই ভৌগোলিক বিস্তার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

উপকূলীয় এলাকায় ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের সম্ভাব্য কয়েকটি কারণের কথা বলেছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় মানুষ অনেক সময় বৃষ্টির পানি বড় পাত্রে জমিয়ে মাসের পর মাস ব্যবহার করে।

ওই জমিয়ে রাখা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। গত বছর বরগুনায় যেসব কারণে সংক্রমণ বেশি হয়েছিল, এবার সেই একই কারণে পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট ও খুলনায় বাড়ছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে তদন্ত করা দরকার।’

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৪২ হাজার ৫৯০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে; মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের। প্রথম পাঁচ মাসে সংক্রমণ তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। জুনে ২ হাজার ৯০৭, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ এবং আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন রোগী ভর্তি হয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেই ভর্তি হয়েছে আরও ৬ হাজার ৭৪৪ জন। মৃত্যুও জুন থেকে বাড়তে থাকে—জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনে ২০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওই ৯ জেলার মধ্যে খুলনায় ৩ হাজার ৭৬২, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৭১২, পিরোজপুরে ১ হাজার ৭০০, গাজীপুরে ১ হাজার ৪৮৫, ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৪৫৩, বাগেরহাটে ১ হাজার ১৮৬, বরিশালে ১ হাজার ১৯৯, কক্সবাজারে ১ হাজার ৬৯ এবং নারায়ণগঞ্জে ১ হাজার ১৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এসব জেলার মধ্যে খুলনায় ১৮, ময়মনসিংহে ১১, বরিশালে ৮, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাটে ও গাজীপুর ১ জন করে ৪ জন মারা গেছে। চলতি বছরে ৪৯ জেলায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত শনিবার রাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দেশের সব বিভাগীয় পরিচালক, হাসপাতালের পরিচালক-তত্ত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে বিশেষ সভা করেছেন। সভায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও সহায়ক কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। জেলা হাসপাতালসহ সব হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও প্রয়োজনীয় ফ্লুইড মজুত এবং প্রয়োজনে ডেঙ্গু কর্নারে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

খুলনায় বেশি চাপ

চলতি বছরে রাজধানীর বাইরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী দেখা গেছে খুলনায়। বর্তমানে বিভাগে ৮৮৫ জন রোগী ভর্তি এবং ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, চলতি বছর খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার পেছনে বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; বিশেষ করে খুলনা নগরীর দুর্বল ড্রেনেজ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে পারে না। অনেক ড্রেন আশপাশের জমি ও সড়কের তুলনায় উঁচু হওয়ায় পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এতে এডিস মশার লার্ভা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আবার বৃষ্টির মধ্যে লার্ভার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। বাগেরহাটে কিছুদিন আগে সংক্রমণ বেশি থাকলেও বর্তমানে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সাতক্ষীরাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে খুলনা নগরীই বিভাগের প্রধান উদ্বেগের জায়গা।

ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে খুলনার হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রয়েছে জানিয়ে ডা. মোশাররফ বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক পদায়ন করা হচ্ছে।

খুলনা মহানগরীর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম গাজী জানান, ডেঙ্গুর জন্য আলাদা শয্যা বা ওয়ার্ড না থাকলেও মেডিসিনের পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডেই রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৩৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে।

রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে। রোগীদের জটিলতার ধরন মোটামুটি একই থাকলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার উপসর্গ বেশি দেখা যাচ্ছে।’

পিরোজপুরে বাড়ছে সংক্রমণ

বরিশাল বিভাগেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ এবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পিরোজপুর জেলায়। সব উপজেলা থেকে কম-বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে।

বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার জানান, এ বছর বিভাগের মধ্যে পিরোজপুরে সংক্রমণ বেশি। পাশের খুলনা বিভাগের বাগেরহাটেও সংক্রমণ বেড়েছে। দুই জেলার মধ্যে যাতায়াতকারী শ্রমজীবী মানুষের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, ‘ডেঙ্গু মোকাবিলায় জেলা হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হাসপাতালে এনএস ১, আইজিএম ও আইজিজি পরীক্ষার কিট এবং পর্যাপ্ত ফ্লুইড রয়েছে। চিকিৎসক ও সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

ডেঙ্গু রোগী বেশি এমন এলাকায় কমিউনিটি পর্যায়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়ে ডা. মুশতাক বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে রোগীদের ঠিকানা নিয়ে ওই এলাকায় গিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শুরুতেই শনাক্ত এবং চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হবে।’

তবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের সরাসরি কোনো সম্পর্ক দেখছেন না কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন সময়ে পরিবেশ এডিস মশার প্রজননের অনুকূলে হয়ে উঠলে সেখানে সংক্রমণ বাড়তে পারে।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাঠপর্যায়ে দল পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের দল পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে তথ্য পাওয়া যাবে, যা সংক্রমণ কেন বাড়ছে, তা বুঝতে সহায়তা করবে।’