হোম > স্বাস্থ্য

সরেজমিন: কুর্মিটোলা হাসপাতাল

ডেঙ্গু রোগীর চাপে হিমশিম, খালি নেই একটি শয্যাও

আবুল বাসার সাজ্জাদ, ঢাকা

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। ৫০ শয্যার ‘ডেঙ্গু কর্নার’ পূরণ হয়ে গতকাল মঙ্গলবার ভর্তি ছিল ৬০ জন। তাই নতুন ডেঙ্গু রোগী এলে তাদের অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু আগের কোনো রোগী ছাড়পত্র পেলে তার বেডে নতুন রোগী ভর্তি করা হচ্ছে।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিটের ৩০০ শয্যার বিপরীতে ডেঙ্গু রোগীর পাশাপাশি অন্যান্য রোগীও চিকিৎসাধীন। সেখানে কোনো শয্যাই খালি নেই। গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, বেড না থাকায় ভর্তি হতে না পেরে ফিরে যাচ্ছে শরীয়তপুর থেকে আসা এক শিশু। চার দিন ধরে জ্বরে ভোগার পর শরীয়তপুরে পরীক্ষা করে তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে ঢাকায় এনে আবার পরীক্ষা করা হলে চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। তবে বেড না থাকায় ভর্তি হতে পারেনি শিশুটি।

শিশুটির বাবা জানান, তিনি ঢাকার মিরপুরে থেকে চাকরি করেন। স্ত্রী-সন্তান থাকেন শরীয়তপুরে। কয়েক দিন ধরে ছেলের প্রচণ্ড জ্বর ছিল। ঢাকায় আনার পর চিকিৎসক ভর্তি হতে বললেও সিট না থাকায় তাকে অন্যত্র নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. জে এম আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর এ সময় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ে। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে লিভার, কিডনিসহ বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বেশি। বর্তমানে জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের রক্ত পরীক্ষা করে প্রায় ২০ শতাংশের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সেখানে ২২০ জনের পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয় ৪৮ জনের, আর সোমবার ২৬৫ জনের মধ্যে শনাক্ত হয় ৩৬ জনের। গতকাল হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৬০ জন ডেঙ্গু রোগী। তাদের মধ্যে ছিল ১৯ জন পুরুষ, ৩৪ জন নারী ও ৭ জন শিশু।

ডেঙ্গু রোগীদের জন্য এই হাসপাতালের নির্দিষ্ট ডেঙ্গু কর্নারে পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা বেডের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে রোগীর চাপ বাড়ায় নির্ধারিত শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি করতে হচ্ছে।

ডা. আরিফুল ইসলাম বলেন, কুর্মিটোলা হাসপাতালে আগে প্রায় ৫০০ শয্যা ছিল। সম্প্রতি শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ৯০০ করা হয়েছে। তবে মেডিসিন ইউনিটে শয্যা রয়েছে ৩০০। এসব শয্যায় ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্যান্য রোগীও চিকিৎসা নিচ্ছে। ফলে নতুন ডেঙ্গু রোগীর জন্য শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। খালি না থাকলে নতুন আসা রোগীদের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ডেডিকেটেড ডেঙ্গু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

সেপ্টেম্বরে বেড়েছে রোগীর চাপ

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ৮ সেপ্টেম্বরের ডেঙ্গু প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এখানে মোট ১ হাজার ৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের।

মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৪৩ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১, মার্চে ১২, এপ্রিলে ২৩, মে মাসে ২১ এবং জুনে ৫৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়। জুলাইয়ে রোগীর সংখ্যা অনেকটা বেড়ে দাঁড়ায় ২১১ জনে। আগস্টে তা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে হয় ৫২২ জন।

অন্যদিকে সেপ্টেম্বরের প্রথম আট দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৮৮ জন। অর্থাৎ আগস্টে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৬ দশমিক ৮ জন রোগী ভর্তি হলেও সেপ্টেম্বরের প্রথম আট দিনে দৈনিক গড় দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৫ জনে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ২৪ জন। নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ১১ জন পুরুষ, ৭ জন নারী ও ৫ জন শিশু।

অনেক রোগীই মশারি ছাড়া

ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা যায়, অনেক রোগীই মশারি ব্যবহার করছে না। প্রায় অর্ধেক ডেঙ্গু রোগীর বেডে মশারি টানানো ছিল না। রোগীদের কেউ কেউ বলেছে, তারা গরমের কারণে মশারি ব্যবহার করছে না। মশারি ব্যবহার না করাদের একজন মহিলা ইউনিট-১-এর ডেঙ্গু বেডে চিকিৎসাধীন নাহিদা সুলতানা। তার মা নাজমা সুলতানা জানান, তাঁদের বেডে মশারি টানানোর স্ট্যান্ড নেই। তবে হাসপাতাল থেকে চাইলে স্ট্যান্ড দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

অন্যদিকে পুরুষ ইউনিট-১-এর ডেঙ্গু বেডে চিকিৎসাধীন রাসেল সিকদারের বেডে মশারি টানানো ছিল না। কারণ জানতে চাইলে তিনিও গরমের কথা বলেন। তবে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি স্ত্রীর সহায়তা নিয়ে মশারি টানিয়ে দেন।

চিকিৎসক আরিফুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা হাসপাতাল থেকে প্রত্যেককে মশারি দিই এবং তা ব্যবহার করতে বলি। ডেঙ্গু রোগীর জন্য মশারি ব্যবহার জরুরি। না হয় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির শরীরে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।