গত কয়েক দশকে দেশের ওষুধশিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এখন দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওষুধে মেটে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও বাড়ছে বাংলাদেশে তৈরি ওষুধের উপস্থিতি। বর্তমানে বিশ্বের দেড় শর বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে দেশে তৈরি ওষুধ। গত পাঁচ বছরে রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য ও নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ায় রপ্তানি আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ ১৬২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ১ হাজার ৭৭৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকার ওষুধ রপ্তানি করে। এর পর থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য হারে তা বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি ৩ হাজার ২৫০ কোটি ১৭ লাখ টাকায় পৌঁছায়। ২০৩০ সালের মধ্যে ওষুধ রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা উদ্যোক্তাদের।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনের জন্য ৩২৩টি ইউনিট নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে ২৫১টি কার্যকর রয়েছে। এ ছাড়া ইউনানি, আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথিক ইত্যাদি ওষুধ উৎপাদনের আরও পাঁচ শর বেশি ইউনিট রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ রপ্তানি আয়ে শীর্ষে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় ছিল ৪০৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা একমি ল্যাবরেটরিজের রপ্তানি ৪০১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। নিপ্রো জেএমআইয়ের রপ্তানি আয় ৩৭২ কোটি টাকা, চতুর্থ ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ৩১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং পঞ্চম অবস্থানে থাকা রেনাটার ২৫৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। শীর্ষ পরবর্তী পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এরিস্টোফার্মা, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস, বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস, হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং জেনারেল ফার্মাসিউটিক্যালস।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা ও রপ্তানির গন্তব্য বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠোর শর্তের বাজারেও বাংলাদেশি ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এ অগ্রগতি ধরে রাখতে পণ্যের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জটিল ও উচ্চমূল্যের ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কমাতে হবে কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার গড়ে তোলা এবং বিদেশে ওষুধ নিবন্ধনের ব্যয় ও জটিলতা মোকাবিলা করাও জরুরি।
ওষুধ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিদেশে পেটেন্ট করা ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ উৎপাদনে বাংলাদেশ সাফল্য পেয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই সুবিধার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি, কাঁচামাল (এপিআই) উৎপাদন ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এই খাতের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা এবং গবেষণা ও উন্নয়নে সীমিত বিনিয়োগের বিষয়টি উঠে এসেছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে বাজারভিত্তিক গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার গড়ে তোলা দরকার। বর্তমানে জৈবসমতুল্যতা পরীক্ষার জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক মান পূরণকারী পরীক্ষাগার দেশে প্রতিষ্ঠা করা গেলে ব্যয় কমবে ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়বে।’
অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার রপ্তানি প্রণোদনার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ওষুধের গুণগত মান, গবেষণা, পণ্য উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ জরুরি বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। তাঁরা মনে করেন, নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ওষুধের বাজারের আলোচনায় পিআইসি/এস এবং আরওডব্লিউ গুরুত্বপূর্ণ দুটি পরিভাষা। পিআইসি/এস হলো ওষুধের উৎপাদনের মান ও কারখানা পরিদর্শন নিয়ে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহযোগিতা ব্যবস্থা। এর অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ, অস্ট্রেলিয়ার টিজিএ ও সিঙ্গাপুরের এইচএসএ। অন্যদিকে আরওডব্লিউ বলতে নির্দিষ্ট প্রধান বাজারের বাইরে থাকা অন্যান্য বাজারকে বোঝায়। এর আওতায় এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের বাজার থাকতে পারে।
উদ্যোক্তাদের মতে, ইউরোপের বাজারে প্রবেশের অভিজ্ঞতা সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কারণ, এসব বাজারের মানদণ্ডে কিছু মিল রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের শর্ত তুলনামূলক কঠিন। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের মতো বড় বাজারেও ওষুধ রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির বড় অংশই যায় আরওডব্লিউভুক্ত বাজারগুলোতে, অর্থাৎ প্রধান বাজারের বাইরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে বাংলাদেশের কিছু ওষুধ প্রবেশ করেছে। এসব বাজারে রপ্তানি বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণ করা জরুরি।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, ‘কাঁচামাল আমদানিতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার তুলনায় রপ্তানি আয় বেশি হতে হবে। আমরা চাই, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প তৈরি পোশাকশিল্পের চেয়েও বড় বাজার তৈরি করুক। বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠান ও ওষুধ নিবন্ধনে বড় অঙ্কের অর্থ লাগে। পণ্যভেদে নিয়মিত ফি এবং নিরীক্ষার খরচও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সরকার ভর্তুকি দিতে পারে। পাশাপাশি সহজ শর্তে পণ্য উন্নয়নের ঋণ দেওয়া যেতে পারে।’
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘বিশ্ববাজারে অবস্থান তৈরির ভিত্তি তৈরি হয়েছে। রপ্তানির বাধা দূর করতে পারলে এই বাজার আরও বাড়বে। এ জন্য সরকারের নীতিগত সহযোগিতা প্রয়োজন।’
আব্দুল মুক্তাদির নীতিগত বাধা দূর করার পাশাপাশি উৎপাদনকারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের ‘যৌক্তিক সামঞ্জস্য’ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন।
বিদেশি বাজারে ওষুধের রপ্তানি বাড়াতে উৎপাদনের মান নিশ্চিত করা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যান্য শর্ত পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে নিবন্ধন ও অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক বিষয়ক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি।’
টিকা রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যাচুরিটি লেভেল-৩ (এমএল৩) অর্জনের উদ্যোগ চলছে বলেও জানান তিনি। এ স্বীকৃতি পেতে টিকার অনুমোদন, কারখানা পরিদর্শন, মান যাচাই ও বাজারজাতের পর নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়।
আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এমএল৩ অর্জন আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়াতে এবং টিকা রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী ওষুধের উৎপাদনমান নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে ওষুধ রপ্তানি শুরু হয় ১৯৮৫ সালে। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধের বাজার প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার। চাহিদার প্রায় পুরোটা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওষুধে মিটলেও কাঁচামালের প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ১৯৮৮ সালে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস দেশে প্রথম কাঁচামাল উৎপাদন শুরু করে। এরপর দেশীয় উৎপাদনে কিছু অগ্রগতি হলেও কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা রয়ে গেছে। কাঁচামালের জন্য শিল্প পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় চালু হয়নি। ফলে ওষুধ রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোও এই শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ।