দেশে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে দুই দশকের বেশি সময় ধরে। বাদুড় বা পাখির মাধ্যমে ছড়ানো নিপাহ ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে বিশেষজ্ঞরা কয়েক বছর ধরে খেজুরের কাঁচা রসপান এবং বাদুড় বা পাখির আধখাওয়া ফল না খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তুলনামূলকভাবে বিরল এ ভাইরাসে সামগ্রিকভাবে মৃত্যুহার ৭০ শতাংশের বেশি থাকলেও গত দুই বছরে তা শতভাগে উঠেছে। বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে প্রায় প্রতিবছর নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত দেশে মোট ৩৪৭ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৪৯ জনেরই মৃত্যু হয়েছে, শতাংশের হিসাবে যা ৭১ দশমিক ৭৫ ভাগ। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শনাক্ত হওয়া মোট নয়জনের প্রত্যেকের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিকতম মৃত্যুহার শতভাগ। এর আগে ৯২ শতাংশ মৃত্যুহার দেখা গিয়েছিল ২০০৫ সালে।
বাংলাদেশে বিশেষ করে শীত মৌসুমে নিপাহ ভাইরাসের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বড় অংশই জ্বাল না দেওয়া খেজুরের রস খেয়েছিল। প্রাদুর্ভাব প্রথম ধরা পড়া থেকে এ পর্যন্ত দেশের ৩৫টি জেলায় এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যটির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
৭ জানুয়ারি আইইডিসিআরে ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় খেজুরের কাঁচা রস ঘিরে আয়োজন করা শীত মৌসুমের ‘রস উৎসব’ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন প্রতিষ্ঠান থেকে খেজুরের কাঁচা রস কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে, তারা লোকজনকে ভোরবেলায় নিজেদের খেজুরবাগানে গিয়ে টাটকা রস খাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কেউ কেউ পাখি বা বাদুড় থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকার দাবিও করেছে।
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বমি, কাশি, ঘাড় ও পেশিতে ব্যথা, অসংলগ্ন আচরণ ও প্রলাপ বকা, খিঁচুনি এবং অচেতন হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণে এনসেফালাইটিস ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি স্বাভাবিকভাবে বেশি। চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে জটিলতা বেড়ে গিয়ে মৃত্যুহার আরও বেড়ে যেতে পারে। আরিফুল বাসার, তত্ত্বাবধায়ক, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল
সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে গত বছর মৌসুমের বাইরেও রোগী শনাক্ত হয়েছে।
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ৩৫টি জেলার মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। দ্বীপজেলা ভোলায়ও নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, নিপাহ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় শূকর খামারিদের মধ্যে প্রাদুর্ভাবের সময়। এরপর সে দেশে আর কোনো নতুন প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশে ২০০১ সালে ভাইরাসটি শনাক্ত হয় এবং তারপর প্রায় প্রতিবছর কমবেশি প্রাদুর্ভাব ঘটছে। ভারতেও, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে সময় সময় রোগটি শনাক্ত হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ড এবং আফ্রিকার মাদাগাস্কার, ঘানাসহ কয়েকটি দেশে ফলখেকো ও অন্যান্য বাদুড়ের মধ্যে এ ভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। ভাইরাসটির প্রথম প্রাদুর্ভাবে অধিকাংশ সংক্রমণ ঘটেছিল অসুস্থ শূকরের সরাসরি সংস্পর্শে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের পরবর্তী প্রাদুর্ভাবগুলোতে সবচেয়ে সম্ভাব্য উৎস রস, ফল বা ফলজাত খাদ্য। বিশেষ করে কাঁচা খেজুরের রস, যা বাদুড়ের মূত্র বা লালায় দূষিত ছিল।
প্রাকৃতিক পরিবেশে নিপাহ ভাইরাস কত দিন টিকে থাকতে পারে, সে সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কিছু প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে মানুষের নিঃসরণ বা বর্জ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে চিহ্নিত হওয়া প্রায় অর্ধেক ঘটনাই এ ধরনের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, নিপাহ ভাইরাসে মানুষের উপসর্গের পরিসর উপসর্গবিহীন থেকে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও প্রাণঘাতী এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) পর্যন্ত হতে পারে। এখনো এ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা টিকা নেই। যে চিকিৎসা দেওয়া হয় তা মূলত সহায়ক। ডব্লিউএইচও ভাইরাসটিকে ২০১৮ সালের গবেষণা পরিকল্পনায় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মহামারি-ঝুঁকিপূর্ণ রোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারী—এই চার জেলায় চারজন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন এবং প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে নওগাঁয় মৃত আট বছরের শিশুর ঘটনাটি ছিল দেশের প্রথম অমৌসুমি নিপাহ কেস। এটি শীতকালে নয়, বরং শরৎ ঋতুতে (আগস্ট মাসে) শনাক্ত হয়। নওগাঁর শিশুর সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস ছিল বাদুড়ের আধখাওয়া ফল—যেমন কালো জাম, খেজুর বা আম। এভাবে শীতে খেজুরের রসের বদলে অন্য মৌসুমের ফল থেকে নিপাহ সংক্রমণের একটি নতুন ও উদ্বেগজনক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন গতকাল সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গত বছরের অক্টোবরের পর দেশে নতুন কোনো নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছি, যাতে কেউ খেজুরের কাঁচা রস পান না করে। হাসপাতালে নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে কেউ এলে দ্রুত পরীক্ষা করা হচ্ছে। শনাক্ত হলে সংক্রমণ যেন না ছড়ায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) আরিফুল বাসার বলেন, ‘নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণে এনসেফালাইটিস এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা হয় বলে মৃত্যুঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি। চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে জটিলতা বেড়ে গিয়ে মৃত্যুহার আরও বেড়ে যেতে পারে। দেরিতে চিকিৎসা শুরু করাও গত দুই বছরে শতভাগ মৃত্যুর একটি কারণ হতে পারে।
ডা. আরিফুল বাসার আরও বলেন, ডব্লিউএইচও নিপাহ ভাইরাসকে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাসম্পন্ন অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশে মৌসুমের বাইরে এবং মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ইতিহাস থাকায় ঝুঁকি আরও বেশি।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সূত্রে জানা গেছে, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের জন্য ঢাকাসহ দেশের প্রায় ৭৫০টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনা ঢাকার আইসিডিডিআরবি ও আইইডিসিআরে পরীক্ষা করা হয়। এ পরীক্ষার ফল পেতে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে।