হোম > স্বাস্থ্য

আলঝেইমার, স্ট্রোক, বিষণ্নতা প্রতিরোধের শক্তি লুকিয়ে আছে সাউনায়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: নিও সায়েন্টিস্ট

দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে থাকা মানুষের জন্য বিপজ্জনক—এ কথা বহুদিন ধরেই জানা। তাপপ্রবাহে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত সময়ের তাপ-চিকিৎসা—বিশেষ করে সাউনা—হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, আলঝেইমার এমনকি বিষণ্নতার ঝুঁকিও কমাতে পারে।

সাউনা হলো একটি বিশেষ ঘর বা কক্ষে নিয়ন্ত্রিত তাপে ঘাম ঝরানোর প্রক্রিয়া। এটি শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিন দূর করতে, রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করতে এবং পেশি শিথিল করতে সাহায্য করে।

১৯৭৬ সালে ব্রিটিশ আর্মির চিকিৎসক এইচ ফস্টার ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে একটি চিঠি লিখে দাবি করেছিলেন, ফিনল্যান্ডে মধ্যবয়সী পুরুষদের মধ্যে হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর উচ্চহারের পেছনে সাউনা ব্যবহারের ভূমিকা থাকতে পারে। যুক্তিটা তখন অমূলক মনে হয়নি। কারণ ৮০–৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সাউনা শরীরের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, হৃৎস্পন্দন বাড়ায় এবং দীর্ঘ সময় সেখানে থাকলে তা প্রাণঘাতীও হতে পারে।

কিন্তু প্রায় চার দশক পর সেই ধারণাই উল্টে দেয় ফিনল্যান্ডেরই গবেষণা।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে

ফিনল্যান্ডের কুওপিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ১৯৮০-এর দশকে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মধ্যবয়সী পুরুষকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণা শুরু করেন। তাদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং সাউনা ব্যবহারের অভ্যাস কয়েক দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

পরে কার্ডিওলজিস্ট জারি লাউক্কানেন এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেন, যারা সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার সাউনা ব্যবহার করেন, তাদের প্রাণঘাতী হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি সপ্তাহে একবার ব্যবহারকারীদের তুলনায় ২২ শতাংশ কম। আর যারা সপ্তাহে চার থেকে সাতবার সাউনা নেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

শুধু তাই নয়, নিয়মিত সাউনা ব্যবহারকারীদের সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। গবেষকদের মতে, সাউনায় বসলে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, রক্তনালি প্রসারিত হয় এবং রক্তসঞ্চালন বাড়ে—যা অনেকটা হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামের মতো শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

স্ট্রোক ও আলঝেইমারের বিরুদ্ধেও সম্ভাবনা

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, নিয়মিত সাউনা ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকিও কম দেখা গেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য এসেছে আলঝেইমার রোগ নিয়ে। যেসব ব্যক্তি সপ্তাহে চার থেকে সাতবার সাউনা ব্যবহার করতেন, তাদের মধ্যে ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে আলঝেইমার হওয়ার হার ছিল সপ্তাহে একবার ব্যবহারকারীদের তুলনায় ৬৩ শতাংশ কম।

পরে প্রায় ১৪ হাজার জাপানি নারী-পুরুষের ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণাতেও একই ধরনের ফল পাওয়া যায়। মাসে ৯ থেকে ১২ বার সাউনা ব্যবহারকারীদের মধ্যে আলঝেইমার শনাক্ত হওয়ার হার মাসে চারবারের কম ব্যবহারকারীদের তুলনায় অর্ধেকেরও কম ছিল।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে হিট শক প্রোটিন নামে বিশেষ কিছু প্রোটিন সক্রিয় হয়। এগুলো কোষের ক্ষতি কমায়, ত্রুটিপূর্ণ প্রোটিন অপসারণে সাহায্য করে এবং আলঝেইমারের সঙ্গে সম্পর্কিত অ্যামিলয়েড ও টাউ প্রোটিন জমা হওয়া ঠেকাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিষণ্নতা কমাতেও আশাব্যঞ্জক ফল

সাউনাকে ঘিরে গবেষণা এখন মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও বিস্তৃত হয়েছে।

ফিনল্যান্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত সাউনা ব্যবহারকারীদের মধ্যে সাইকোসিসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।

অন্যদিকে, ‘হোল-বডি হাইপারথার্মিয়া’ নামে একটি পদ্ধতিতে শরীরের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রা প্রায় ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ানোর পর বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীদের মানসিক উপসর্গ প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায় এবং এই ইতিবাচক প্রভাব কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

গবেষকদের ধারণা, তাপ শরীরের প্রদাহ কমাতে পারে এবং মস্তিষ্কে সেরোটোনিন উৎপাদন বাড়িয়ে মেজাজ উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও বৃহৎ পরিসরের গবেষণা চলছে।

মানুষ কেন গরম সহ্য করতে পারে

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের শরীরের একটি বিশেষ বিবর্তনগত বৈশিষ্ট্যই সাউনার উপকারিতার ভিত্তি।

মানুষের শরীরে প্রচুর ইক্রাইন ঘর্মগ্রন্থি রয়েছে, যা ঘামের মাধ্যমে শরীরকে ঠান্ডা রাখে। ঘাম বাষ্পে পরিণত হওয়ার সময় শরীর থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ বেরিয়ে যায়। ধারণা করা হয়, প্রায় ১০ লাখ বছর আগে এই বৈশিষ্ট্যই মানুষের পূর্বপুরুষদের প্রচণ্ড গরমেও দীর্ঘ সময় চলাফেরা ও শিকার করার সক্ষমতা দিয়েছিল।

আজও সেই জৈবিক ব্যবস্থাই আমাদের নিয়ন্ত্রিত তাপ-চাপ সহ্য করতে এবং তার সুফল পেতে সাহায্য করে।

সতর্কতাও জরুরি

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব গবেষণার বেশির ভাগই পর্যবেক্ষণভিত্তিক। অর্থাৎ, সাউনা ব্যবহার ও সুস্বাস্থ্যের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, সাউনাই সরাসরি সব উপকারের একমাত্র কারণ—এটি এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।

এ ছাড়া, ফিনল্যান্ডে প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সাউনা ব্যবহার করেন। ফলে যারা কখনোই সাউনা ব্যবহার করেন না, এমন মানুষের সংখ্যা গবেষণায় খুবই কম ছিল। যদিও গবেষকেরা বয়স, ধূমপান, মদ্যপান, শারীরিক কার্যকলাপ, ওজন ও সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার মতো বিষয়গুলো হিসাবের মধ্যে রেখেছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদ্‌রোগ, নিম্ন রক্তচাপ বা অন্য গুরুতর শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাউনা ব্যবহার করা উচিত নয়। সাউনার সময় ও পরে পর্যাপ্ত পানি পান করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও সামাজিক সম্পর্কের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত তাপ-চিকিৎসা ভবিষ্যতে দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন গবেষকেরা। যদিও এর আদর্শ সময়, তাপমাত্রা ও ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

হামের উপসর্গে মৃত্যু আরও ৫, মোট ৭৯৩

২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৩ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৩৭২

হামের প্রাদুর্ভাব: বিশেষ টিকার দুই মাস পরও কমেনি হাম

ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৪৭৩

হাম: উপসর্গে মৃত্যু আরও ৪, মোট ৭৮৮

চাকরিতে নাইট ডিউটি: মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, সুস্থ থাকার দাওয়াই দিলেন বিজ্ঞানীরা

খুশির চোটে মরতে বসেছেন নারী, বিরল সমস্যার সন্ধান পেলেন চিকিৎসকেরা

ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২৪২

হামের প্রাদুর্ভাব: উপসর্গে আরও ৪ জনের মৃত্যু, মোট ৭৮৪

টানা বৃষ্টিতে বাড়ছে রোগবালাই লক্ষণ বুঝে সচেতন হোন