দেশে কয়েক মাস ধরে হামের টিকার সংকট চলছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) হামের টিকার সরবরাহ ঘাটতি ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রকল্প তৈরি, অনুমোদন, অর্থছাড়সহ নানা প্রক্রিয়াগত কারণে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে।
সরকার বলছে, টিকার সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রায় শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক হাম রোগের প্রাদুর্ভাবে চলতি বছরে এ পর্যন্ত দেশে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ইপিআই সারা বছর যে ১২টি রোগের জন্য ১০টি টিকা দেয়, সেগুলোর মধ্যে হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর টিকাও রয়েছে।
ইপিআই সূত্র জানায়, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৯-১৫ মাস বয়সী শিশুদের দুই ডোজ এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়। তবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এই টিকার সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। দেশের ৬৪টি জেলায় এই তিন মাসে এমআর টিকার মোট চাহিদা ছিল ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪১০ ভায়াল (প্রতি ভায়ালে ৫ ডোজ টিকা থাকে)। কিন্তু সরবরাহ করা গেছে মাত্র ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫০ ভায়াল। ফলে মোট চাহিদার মাত্র ২৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ ৭২ দশমিক ৫৫ শতাংশ টিকা সরবরাহ করা যায়নি। এই ঘাটতি মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই ঘাটতির কারণে অনেক শিশুই নির্ধারিত সময়ে টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা হামের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে ইপিআইয়ের মাধ্যমে দেওয়া পেন্টাভ্যালেন্ট, বাইভ্যালেন্ট ওরাল পোলিও (পওপিভি), বিসিজি, ইন-অ্যাকটিভেটেড পোলিও (আইপিভি), নিউমোকক্কাল কনজুগেট (পিসিভি), এমআর এবং টিটেনাস-ডিপথেরিয়া (টিডি) টিকার এই সময়ে চাহিদা ছিল ৫১ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩ ভায়াল। সরবরাহ করা হয়েছে ২৫ লাখ ২৯ হাজার ৭৪০ ভায়ালের কিছু বেশি।
ইপিআইয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) থেকে হঠাৎ রাজস্ব খাতে যাওয়ায় টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সূত্র জানায়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদানসহ দেশের স্বাস্থ্য খাতের ৩০টির বেশি উদ্যোগ আগে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার (ওপি) মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। সর্বশেষ ওপি ছিল ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি)’, যা ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়। এরপর নতুন কোনো ওপির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ২০২৫ সালের আগস্টে সরকার রাজস্ব খাতের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু রাখার পরিকল্পনা নেয়। তবে প্রকল্প তৈরি, অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়সহ নানা প্রক্রিয়াগত কারণে টিকাসহ স্বাস্থ্য খাতের কার্যক্রমে বিলম্ব দেখা দেয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কেনা টিকা দিয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালানো হয়। কিন্তু নতুন অর্থ ছাড় না হওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ৪১৯ কোটি টাকার মধ্যে ২০০ কোটি টাকার টিকা আগেই প্রি-ফাইন্যান্সিংয়ের ইউনিসেফের মাধ্যমে এসেছে। অবশিষ্ট অর্থছাড় হলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে টিকা পাওয়া যাবে। ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়নের পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টিকা দিতে অন্তত এক থেকে দুই মাস লাগে। আগে সরাসরি কেনা যেত। এখন প্রতিটি ধাপে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে সময় বেশি লাগে। তবে মন্ত্রিপর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ায় জটিলতা কমবে।
হাম প্রতিরোধে ইপিআইয়ের অধীনে ৯-১৫ মাস বয়সী শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচিতে ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু টিকা পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা বাড়ায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হওয়ার প্রভাবই এই সংকটের মূল কারণ। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হঠাৎ ওপি বন্ধ করা ঠিক হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম সচল রাখা কঠিন। জুন-জুলাইয়ে নতুন বাজেট আসার পরও কার্যক্রম বাস্তবায়নে তিন মাস লেগে যায়। তাই পাঁচ বছর বা তার বেশি মেয়াদের স্থায়ী পরিকল্পনা প্রয়োজন। নইলে এ ধরনের সংকট পুনরায় দেখা দেবে। র্যাভিস টিকার ক্ষেত্রে এটাই ঘটেছে।’
চলতি বছর গত সোমবার পর্যন্ত ৬৭৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ৭৫ গুণ বেশি। ২০২৫ সালের একই সময়ে হামে আক্রান্ত শিশু ছিল মাত্র ৯ জন। ২০২৪ সালে ছিল ৬৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগেই হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। সরকারিভাবে এখনো মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হামে অর্ধশতাধিক শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২৫ শিশু; বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬; ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫; চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪; রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে একজন করে এবং বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৮টি শিশু মারা গেছে। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি হাম রোগী (৩৬ দশমিক ২৪ শতাংশ) শনাক্ত হয়েছে। এরপর রয়েছে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা, সিলেট ও রংপুর বিভাগ।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সেখানে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশের বয়স ৬ মাসের কম। হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮ শিশু চিকিৎসাধীন। এদের মধ্যে সোমবার দুপুর থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ১৬ শিশু। সবচেয়ে বেশি শিশু এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে।
রাজশাহী মেডিকেলে সোমবার দুপুর থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
নাটোর সদর হাসপাতাল সূত্র জানায়, মার্চে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৮ শিশু ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে ১৪ শিশুর হাম নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে তিন শিশু চিকিৎসাধীন।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, জানুয়ারির শেষ থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৯ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে গত তিন মাসে ২৯৩ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়। তাদের ৫টি শিশু মারা গেছে। বর্তমানে হাম আইসোলেশন কর্নারে ৭৭ শিশু চিকিৎসাধীন।
সিলেটের হাসপাতালে হাম উপসর্গে ৩০ শিশু ভর্তি রয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ছয় মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আজকের পত্রিকার ঢাকার বাইরের নিজস্ব প্রতিবেদক, জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা]