ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা ১৬ বছর বয়সী ইকবাল। দিনের প্রায় পুরোটায় সময়ই সে কাটায় পুকুরের পানিতে। তার দাবি, পানি থেকে উঠে এলেই শরীরে তীব্র জ্বলুনি হয় তার। বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেও এর কোনো সমাধান মেলেনি বলেও জানায় সে।
একে চিকিৎসকেরা এরিথ্রোমেলালজিয়া নামে বিরল এক রোগ হিসেবে আশঙ্কা করছেন। তবে এই রোগটিই কি না এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এরিথ্রোমেলালজিয়া স্নায়ু ও ছোট রক্তনালির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিরল রোগ। এর প্রভাবে শরীরের কোনো অংশে তীব্র জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব দেখা যায়। শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। হঠাৎ উপসর্গ বেড়ে যাওয়ার সময় আক্রান্ত স্থান গরম, লাল, ফুলে যাওয়া এবং অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে উঠতে পারে। ব্যথা কখনো ঝিনঝিন অনুভূতি থেকে শুরু করে তীব্র জ্বালাপোড়ায় রূপ নিতে পারে। এ কারণে শরীর ঠান্ডা করলে কিছু রোগী সাময়িক স্বস্তি পান।
সাধারণত পা আক্রান্ত হলেও হাত, বাহু, পা, কান ও মুখও আক্রান্ত হতে পারে। শরীরের এক বা উভয় পাশে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ কয়েক মিনিট থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে টানা ব্যথা হয়ে থাকে।
তীব্র জ্বালাপোড়া: আক্রান্ত স্থান আগুনে পুড়ছে বা গরম পানিতে ঝলসে গেছে এমন অনুভূতি হতে পারে।
লালচে ভাব: উপসর্গ বেড়ে যাওয়ার সময় ত্বক দৃশ্যত লাল হয়ে যেতে পারে।
ত্বকের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া: আক্রান্ত স্থান আশপাশের ত্বকের তুলনায় বেশি গরম অনুভূত হতে পারে।
ফোলা: হাত, পা বা শরীরের অন্য আক্রান্ত অংশ ফুলে যেতে পারে।
ঝিনঝিন বা চুলকানি: উপসর্গ শুরু হওয়ার আগে বা চলাকালে কারও কারও এমন অনুভূতি হতে পারে।
ঘাম বেশি হওয়া: আক্রান্ত স্থানে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘাম হতে পারে।
উপসর্গ কমার পর ত্বক ঠান্ডা হওয়া: তীব্র উপসর্গের পর কখনো ত্বক ঠান্ডা হয়ে নীলচে বা ধূসর দেখাতে পারে।
এরিথ্রোমেলালজিয়ার সঠিক কারণ সব সময় জানা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে জিনগত পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা যায় না।
বংশগত এরিথ্রোমেলালজিয়ার ক্ষেত্রে এসসিএননাইনএ (SCN9A) জিনের পরিবর্তন স্নায়ুর মাধ্যমে ব্যথার সংকেত পরিবহনে যুক্ত সোডিয়াম চ্যানেলের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্য কিছু রোগের কারণেও দ্বিতীয় পর্যায়ের সমস্যা হিসেবে এরিথ্রোমেলালজিয়া দেখা দিতে পারে। তাই এটি শুধু জিনগত সমস্যা ধরে নেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকেরা অন্য কোনো অন্তর্নিহিত রোগ উপসর্গগুলোর সঙ্গে যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখতে পারেন।
উপসর্গের সঙ্গে রক্তপ্রবাহ ও ব্যথার সংকেত নিয়ন্ত্রণের অস্বাভাবিকতার সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। উপসর্গ বেড়ে যাওয়ার সময় ত্বকে রক্তপ্রবাহ বেড়ে গেলে তাপ, লালচে ভাব ও জ্বালাপোড়া তীব্র হতে পারে।
এরিথ্রোমেলালজিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, শরীর বা আক্রান্ত স্থান গরম হয়ে গেলে উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে। গরম আবহাওয়া, ব্যায়াম, আঁটসাঁট জুতা বা পোশাক, মানসিক চাপ, পানিশূন্যতা, অ্যালকোহল, ঝাল খাবার এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনও উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে।
উষ্ণতায় উপসর্গ তীব্র হতে পারে বলে গুরুতর এরিথ্রোমেলালজিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা আক্রান্ত স্থান ঠান্ডা করার উপায় খুঁজতে পারেন। পুকুরের পানির ওপর ওই কিশোরের নির্ভরশীলতার পেছনেও এটি একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
এরিথ্রোমেলালজিয়া নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক পরীক্ষা নেই। চিকিৎসকেরা সাধারণত রোগীর উপসর্গ, চিকিৎসার ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা বিবেচনা করেন। বিশেষ করে উপসর্গ তীব্র থাকার সময়ের লক্ষণ রোগনির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে।
অন্যান্য রোগের সম্ভাবনা বাদ দিতে চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে, রক্ত পরীক্ষা, জিনগত পরীক্ষা, অন্তর্নিহিত রোগ শনাক্তের পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী ইমেজিং বা অন্যান্য পরীক্ষা এবং বরফ বা অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি কেন বিপজ্জনক হতে পারে।
শরীর ঠান্ডা করলে সাময়িকভাবে জ্বালাপোড়ার অনুভূতি কমতে পারে। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডা করা নিরাপদ নয়। উপসর্গ থেকে দ্রুত স্বস্তি পেতে কেউ কেউ বরফ, বরফমিশ্রিত পানি বা দীর্ঘ সময় ঠান্ডা পানিতে শরীর ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন, যা ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
বারবার জ্বালাপোড়া, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক উষ্ণতা অনুভূত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এরিথ্রোমেলালজিয়ার মতো বিরল রোগের ক্ষেত্রে সঠিক রোগনির্ণয় এবং রোগীভেদে উপযোগী চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রয়োজন।