সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশুদের বেধড়ক পেটানো ও নির্যাতনের খবর প্রকাশের পর, পায়ে শিকল পেঁচানো ১০ বছর বয়সী এক কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে টহল পুলিশ উদ্ধার করেছে—এমন দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, ‘পায়ে শিকল পেঁচিয়ে দুটি তালা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছিল ১০ বছর বয়সী কওমি মাদ্রাসার শিশু শিক্ষার্থী নাঈমকে। রাত ৩টায় শিকল পরা অবস্থায় পালিয়ে রাস্তায় উঠে আসলে টহল পুলিশের সহযোগিতায় সে উদ্ধার হয়।’
এই দাবিতে ফেসবুকে ‘Mujib Spring- মুজিব বসন্ত’ , ‘দূর্জয় মাটি দূর্জয় দেশ’ , ‘নারায়ণগঞ্জ নিউজ’ , ‘নোয়াখালী নিউজ’ , ‘Sadika Islam’ -সহ ৩০টিরও অধিক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে গতকাল (১৪ জুন) ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছে।
‘Jhorna Aktar’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি শেয়ার করে মাদ্রাসার সার্বিক পরিবেশ ও শিক্ষকদের আচরণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানান। শেয়ার করা এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নেটিজেনদের বড় অংশ ঘটনাটিকে সম্প্রতি সময়ের বাস্তব চিত্র মনে করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করছেন এবং সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
আলোচিত ভিডিওটিতে নোয়াখালীর দাগনভূঞার পূর্বচন্দ্রপুর এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ থাকলেও, এটি ঠিক কবেকার ঘটনা সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড নিয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক ‘দেশ রূপান্তর’-এর ওয়েবসাইটে ২০২২ সালের ১৩ জুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর সাদৃশ্য রয়েছে।
‘শেকলে বেঁধে ৭ বছরের শিশুকে নির্যাতন’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের দেউলিয়া নুরানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাত বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে পায়ে লোহার শিকল বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। শিশুটি মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর টহলরত পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। পরে অভিযোগের ভিত্তিতে অধ্যক্ষকে আটক করা হয়।
পুলিশ জানায়, চলতি বছরের (২০২২) শুরুতে শিশুটিকে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে এবং অন্য শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার আগের দিন শিশুটির বাবা তাকে দেখতে গেলে সে নির্যাতনের বিষয়টি জানায়। মাদ্রাসায় আর থাকতে চায় না বলেও বাবাকে অনুরোধ করে। তবে বাবা তাকে বুঝিয়ে মাদ্রাসায় রেখে আসেন।
পরবর্তীতে শিশুটির অভিযোগের বিষয়টি জানতে পেরে অধ্যক্ষ ক্ষিপ্ত হন এবং তাকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে একটি কক্ষে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তাকে মারধরও করা হয়। পরে রাতের দিকে বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে শিশুটি কৌশলে মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে আসে।
রাত প্রায় ৩টার দিকে টহলরত পুলিশ শিকল পরা অবস্থায় শিশুটিকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পরে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে আটক করে পুলিশ।
সে সময় জাতীয় দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’ -সহ একাধিক গণমাধ্যমেও হুবহু একই তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মূলধারার এসব প্রতিবেদনের তথ্যের সাথে ভাইরাল ভিডিওর দৃশ্যেরও মিল রয়েছে।
এ ছাড়া, দাবিটি প্রচারকারী ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেগুলোতে নিয়মিতভাবে সূত্র ও প্রমাণ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের দাবি ও অপতথ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে থাকে।
২০২২ সালের জুনে ফেনীর দাগনভূঞায় একটি মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীকে শিকলে বেঁধে নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হয়। সেই শিশুকে উদ্ধারের ভিডিওটি সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে।