হোম > ফ্যাক্টচেক > দেশ

চুরি, ছিনতাই ও অগ্নিকাণ্ডকে সংখ্যালঘু নির্যাতন বলে প্রচার

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে-এর ভিন্ন ভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক হামলার দাবিতে একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

আলোচিত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া এসব পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, খ্রিস্টান ধর্মের লকেট পরার অপরাধে এক তরুণীকে মারধর, হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে এক ব্যক্তিকে নর্দমায় ফেলে পাথর নিক্ষেপ এবং পটুয়াখালীতে ইসলামপন্থীদের দ্বারা হিন্দুদের বাড়িঘর ও দোকানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

আলোচিত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ভিডিওগুলোকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া হলেও দাবিগুলোর পক্ষে কোনো তথ্যসূত্র বা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়নি। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় ভিডিওগুলোর প্রকৃত উৎস, প্রকাশের সময় এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত ভিডিওগুলো ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার হলেও সেগুলোকে প্রকৃত প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

খ্রিষ্টান তরুণীকে মারধর ও হিজাব পরতে বাধ্য করার দাবি

খ্রিষ্টান তরুণীকে নির্যাতন দাবিতে প্রচার। ছবি: স্ক্রিনশট

সম্প্রতি একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী এক তরুণী গলায় ধর্মীয় ‘ক্রস’ লকেট পরার কারণে তাঁকে মারধর ও যৌন হয়রানি করে হিজাব পরতে বাধ্য করা হয়েছে। তবে আলোচিত দাবির পক্ষে গণমাধ্যমে কোনো প্রতিবেদন কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে তথ্য পাওয়া যায়নি।

ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধানে ‘Mofizur Rahman’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ওই ভিডিওর ক্যাপশন থেকে জানা যায়, কক্সবাজারের রামু সিটি পার্কের ভেতরে মোবাইল চুরি করার পর কক্সবাজার সিটি কলেজের সামনে ‘কোহিনূর’ নামে এক নারী টিকটকার হাতেনাতে ধরা পড়েন এবং স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়েন। ওই ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর হুবহু মিল পাওয়া যায়।

ফেসবুক পেজের ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিতে অনুসন্ধানে, টিকটকে ‘@cr_kohinoor_cox’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট পাওয়া যায়। অ্যাকাউন্টটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কোহিনূর নামের ওই নারী টিকটকারের একাধিক ভিডিওতে তাঁর অবয়বের সঙ্গে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওর তরুণীর সাদৃশ্য রয়েছে।

টিকটক অ্যাকাউন্টের ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত ভিডিওটি এর আগেও ভিন্ন দাবিতে ছড়ানো হয়েছিল। এ নিয়ে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনও পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভিডিওতে থাকা নারীর নাম কোহিনূর এবং তিনি কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের একজন রোহিঙ্গা মুসলিম এবং পেশায় একজন টিকটকার। অর্থাৎ, চুরি করার অভিযোগে এক তরুণীকে মারধরের পুরোনো ঘটনাকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে।

হিন্দু ব্যক্তিকে নর্দমায় ফেলে পাথর মারার দাবি

হিন্দু ব্যক্তিকে নর্দমায় ফেলে নির্যাতন দাবিতে প্রচার। ছবি: স্ক্রিনশট

Krishanu Singha’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে গত ২১ জুন একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। একজন হিন্দু ব্যক্তিকে বড় নর্দমার নোংরা পানিতে ফেলে দিয়ে তাঁর ওপর ইট-পাথর ও বাঁশ দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে গত ১৭ জুন ‘Qawmi Voice 24’ নামের একটি পেজ থেকে শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ওই ভিডিওর সঙ্গে প্রচারিত ভিডিওর সাদৃশ্য রয়েছে। ওই ভিডিওর ক্যাপশনে দাবি করা হয়, গত ১৬ জুন যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা মোড়ে মোবাইল ছিনতাইকারী আটক; জনতার গণধোলাইয়ের ভয়ে পচা পানিতে ঝাঁপ দিয়েও শেষ রক্ষা হলো না। একই তথ্য পাওয়া যায়, ভিডিওর ভেতরে থাকা লেখা থেকেও।

এ ছাড়া ভিডিওতে উপস্থিত জনতাকে ‘চোর’, ‘ছিনতাইকারী’, ‘খালি মানুষের ফোন ছিনতাই করোস’ ইত্যাদি বলতে শোনা যায়। আরও কিছু পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়।

Qawmi Voice 24 পেজের ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

বিষয়টি নিশ্চিত হতে ‘Qawmi Voice 24’ নামের পেজটির অ্যাডমিন উজাইফা আল মাহাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিম। তিনি জানান, যাত্রাবাড়ী বড় মাদ্রাসার পাশে প্রায়ই চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তাঁর পরিচিত অনেকের সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটেছে। সেদিন (১৬ জুন) এক ব্যক্তি ফোন চুরি করতে গিয়ে আটক হন। ওই ঘটনাটির ভিডিওই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, ওই ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় বিষয় জড়িত নয়।

পটুয়াখালীতে হিন্দু বাড়িতে অগ্নিসংযোগের দাবি

পটুয়াখালীতে সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন। ছবি: স্ক্রিনশট

অপরদিকে গত ২৪ জুন ‘@HinduVoice_in’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়, পটুয়াখালী শহরে ইসলামপন্থীরা সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে।

ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সহিংসতা চলছে। সম্প্রতি পটুয়াখালী জেলা থেকে এ সংক্রান্ত খবর পাওয়া গেছে। পটুয়াখালী শহরে ইসলামপন্থীরা হিন্দু সংখ্যালঘুদের ৫টি বাড়ি ভাঙচুর করেছে এবং সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু পরিবারগুলো অসহায়ভাবে কান্নাকাটি করছে। মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সরকার এবং প্রশাসন তাদের কোনো ধরনের সাহায্য করেনি।

আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওটিতে থাকা ‘এখন বাংলা টিভি’র লোগোর সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানে ‘Ekhon Bangla Tv’ নামের ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ৬ মার্চ শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ওই ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা, ‘আমার সার্টিফিকেট সব পুড়ে শেষ, এখন আমরা কী করব? পটুয়াখালীতে পাঁচটি বসতবাড়িসহ দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’ এ ছাড়া ওই ভিডিওতে ভুক্তভোগী এক তরুণীকে বলতে শোনা যায়, সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তাঁর ল্যাপটপ, বই, সার্টিফিকেট, ফোন—কোনো কিছুই রক্ষা করা যায়নি। ওই তরুণী আরও বলেন, পাশের একটি পাগলের ঘর থেকে আগুন লেগেছে। এর আগেও ওই ঘর থেকে কয়েকবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।

এখন বাংলা টিভি ও চ্যানেল২৪-এর ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

একই ঘটনায় ‘চ্যানেল টুয়েন্টিফোর’-এর ভিডিও প্রতিবেদনে এক ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে বলতে দেখা যায়, ‘পার্শ্ববর্তী ঘরে এক মহিলা আছে উনি নাকি কয়েল ধরায়ে রেখে ঘুমিয়েছে। কয়েল থেকে আগুন লেপ-তোষকে ধরছে। উনি যদি চাপা দিয়ে ধরতো তাইলে তো ওইতো না। কিন্তু উনি কোনো পতিক্রিয়ায় দেখাইনি। এরপর আমাদের তো কাঠের ঘর...।’

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বাংলানিউজ২৪-সহ একাধিক মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পটুয়াখালী জেলা শহরের জুবিলী স্কুল সড়কের মনসা মন্দির সংলগ্ন এলাকায় ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ, আনসার ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো হিন্দু ধর্মাবলম্বী (জয়ন্তু রায়, নির্মল কর্মকার প্রমুখ) হলেও অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো ধরনের হামলা, ভাঙচুর কিংবা সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় ইস্যুর অস্তিত্ব ফায়ার সার্ভিস বা স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে পাওয়া যায়নি।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

আলোচিত বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এক্স অ্যাকাউন্টগুলো পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ওই অ্যাকাউন্টগুলোর বায়োতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও এলাকার নাম লেখা রয়েছে। এ ছাড়া ওই হ্যান্ডেলগুলো থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ-বিরোধী ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com

আ.লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে প্রচারিত দাবিটি বানোয়াট

বিশাল মিছিলটি আ.লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর নয়, ২০২৪ সালে গোপালগঞ্জের

মেহেরপুরে ফার্মেসি দোকানিদের মারামারির ভিডিওকে চাঁদাবাজির ঘটনা বলে প্রচার

হানিফ সংকেতের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডটি ভুয়া

ছাগল চুরি করতে এসে বিএসএফ সদস্য আটক দাবির ছবিটি এআই নির্মিত

নিজেদের আমলে শ্লীলতাহানির ঘটনাকে বিএনপি শাসনামলের বলে প্রচার করছে আওয়ামী লীগ

বিমানবন্দরে মাদকসহ আটক ভারতীয় নাগরিকের ঘটনাকে জুলাই আন্দোলনের নেতা দাবিতে প্রচার

গাইবান্ধায় কলেজছাত্র খুন ও বাড়িতে হামলার ঘটনাটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধের, রাজনৈতিক নয়

আফগানিস্তানে জঙ্গি প্রশিক্ষণের ভিডিওকে বাংলাদেশের দাবিতে প্রচার

মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীকে শিকলে বেঁধে নির্যাতনের ভিডিওটি ২০২২ সালের