‘যে শিক্ষার্থী ১১ সাবজেক্টে এ প্লাস পায় সে এক সাবজেক্টে কীভাবে ফেইল করে? এই সরকার পরিকল্পিতভাবে জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষার্থীদের সাথে এমন অবিচার করছে’—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরে গতকাল থেকে ছড়ানো ( ১ , ২ , ৩, ৪ )
ভিডিওটি নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
১১ আগস্ট ‘Crack Platoon Bangladesh’ নামের একটি ফেসবুক পেজে শেয়ার করা ভিডিওটি প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার বারের বেশি দেখা হয়েছে। এ ছাড়া পোস্টটিতে ১৯ হাজার ২০০ রিয়েকশন, ৩৪৭ কমেন্ট ও ৫৬২ শেয়ার রয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া পোস্টটির কমেন্ট পর্যালোচনা করে নেটিজেনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও অনেকে দাবিটিকে সত্য ভেবে মতামত দিয়েছেন। পোস্টের কমেন্টে একজন লেখেন, ‘১৭/০৮/২০২৬ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। প্রতি বিষয়ে ১৫০ টাকা ও কিছু ফি লাগবে। কেউ করতে চাইলে নক দিন। এবার সম্পূর্ণ খাতা আবার রিভিউ করা হবে।’ আরেকজন বলেন, ‘এরা টিকটকার।’ অপর একজন বলেন, ‘এগুলো পুরোনো ভিডিও।’
ভিডিওটিতে কালো মাস্ক পরা এক মেয়েকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার ১১টা সাবজেক্টে এ প্লাস আসছে, একটা সাবজেক্টে ফেল আসছে। আমি যদি ১১টা সাবজেক্টে এ প্লাস পাই, তাহলে আমার কি একটা সাবজেক্টে ৩৩ পেয়ে পাস করার যোগ্যতা নেই? আমার কেমিস্ট্রিতে এমসিকিউ হয়েছে ১৭টি, সিকিউ ৫টি দিয়েছি। তারপরও কীভাবে ফেল আসে? আমার এক বন্ধুর ফিজিক্সে এমসিকিউ হয়েছে ৭টি, সে পাস করেছে। আমি কীভাবে ফেল করি?’ এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এখানে কি দুর্নীতি নেই?’
এ সময় অপরপক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়, ‘এখানে দোষটা কার?’ জবাবে মেয়েটি বলে, ‘অবশ্যই যারা খাতা দেখেছে, তাদের দোষ।’ এ সময় তার পাশে থাকা কালো মাস্ক পরা আরেক মেয়ে বলে, ‘খাতা তো দেখিয়েছে টিকটকার বাচ্চাদের দিয়ে। একটা ছোট বাচ্চা যদি কেমিস্ট্রি, ফিজিক্সের খাতা দেখে, তাহলে সে কী দেখবে আর কী দেবে?’
এ ছাড়া, ৫২ সেকেন্ডের প্রচারিত ভিডিওটিতে মাইক বুমে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলা নিউজের লোগো এবং ‘৪ দফা দাবিতে ঢাকা বোর্ডের সামনে অকৃতকার্যদের আন্দোলন’ লেখা একটি ব্যানার দেখা যায়।
প্রথমেই আলোচিত দাবিটির বিষয়ে অনুসন্ধান করে জাতীয় কোনো গণমাধ্যমে এর পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেমের মাধ্যমে অনুসন্ধানে এটিএন বাংলা নিউজের ফেসবুক পেজে গত বছরের ১৭ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ‘১১টা বিষয়ে এ প্লাস পাইছি আমি আর একটা বিষয়ে কিভাবে ফেল করি’ ক্যাপশনে প্রকাশিত ওই ভিডিওর ১ মিনিট ২৩ সেকেন্ড থেকে ২ মিনিট ১৪ সেকেন্ড পর্যন্ত অংশের সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির হুবহু মিল পাওয়া যায়।
এ ছাড়া, ওই ভিডিওতে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার ফল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। পাশাপাশি, ‘৪ দফা দাবিতে ঢাকা বোর্ডের সামনে অকৃতকার্যদের আন্দোলন’ লেখা ব্যানার নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতেও দেখা যায়।
এই সূত্র ধরে আরও অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় টিভির ওয়েবসাইটে ‘যে ৪ দাবিতে এসএসসিতে অকৃতকার্যদের ‘মার্চ টু সচিবালয়’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবিতে আন্দোলন করে। গত বছরের ১৭ জুলাই বিকেলে তারা ‘মার্চ টু সচিবালয়’ কর্মসূচি নিয়ে সচিবালয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছালে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার কথা জানানো হলে শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যায়।
এর আগে ওই দিন দুপুরে রাজধানীর বকশীবাজারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে জড়ো হয়ে শিক্ষার্থীরা তিন ঘণ্টারও বেশি সময় বিক্ষোভ করে। তাদের চার দফা দাবির মধ্যে ছিল—প্রশ্নপত্রের বৈষম্য দূর করা, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা নেওয়া, এমসিকিউ ও সিকিউ উভয় অংশ মিলিয়ে পাসের ব্যবস্থা করা এবং অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তি নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া আরও কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন (১, ২) থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়।
১১ সাবজেক্টে এ প্লাস পাওয়ার পরও শিক্ষার্থীকে ফেল করিয়ে দেওয়া হয়েছে দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষা পরবর্তী বিক্ষোভের। ফল পুনর্বিবেচনার দাবিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পুরোনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।