ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ৩০-এর অধিক হিন্দু বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
‘Bappa Sarkar’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ১৮ মিনিটে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়। প্রচারিত ওই ভিডিওটি ৭ অক্টোবর দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রায় ৭৫ হাজার বারের বেশি দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটিতে ২ হাজার রিয়েকশন, ২৫৩ কমেন্ট ও ৮৪৫ শেয়ার রয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর কমেন্ট পর্যালোচনা করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পোস্টের কমেন্টে একজন লিখেন, ‘নামাজ পড়ে এই ধর্মশান্তির কাজ করছেন, এই তো ইসলাম।’ আরেকজন বলেন, ‘এসব তো প্রায় ঘটছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সহায়তায় মামলা করতে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’
অন্য একজন লিখেন, ‘ভিডিওগুলো আপলোড করার সময় অবশ্যই তারিখ দিয়ে দিবেন।’ আরেকজন আবার বলেন, ‘সোর্স: গোবর মোরা খাচ্ছি... ভারত থেকে বলছি।’
আলোচিত দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড দিয়ে অনুসন্ধান করেও গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে ৩০টির বেশি হিন্দু বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকটি ঘর আগুনে পুড়ে যেতে দেখা যায়। ভিডিওতে ‘আবারও সেই একই মিথ্যা অপবাদ ধর্ম অবমাননা, এবার একসঙ্গে ৩০টি হিন্দু বাড়িতে আগুন দিল ইসলামী জেহাদীরা’ এবং ‘বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য না পুলিশ আছে, না প্রশাসন, না কোনো রাজনৈতিক নেতা’—এমন লেখা রয়েছে। তবে ভিডিওতে ঘটনাটি কবে কিংবা কোথায় ঘটেছে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য উল্লেখ নেই।
পরে ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধানে ময়মনসিংহ থেকে পরিচালিত ‘Nobo Jagoron TV’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ‘গতকাল গফরগাঁওয়ের মাটিতে কোন ধর্ষণকারী ঠাঁই নাই, যেই কাজের সাথে জড়িত থাকবে তারই পরিণতি এই হবে, শাস্তি দেখে শিক্ষা নেও’—ক্যাপশনে একটি ভিডিও পাওয়া যায়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর শেয়ার করা ওই ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর দৃশ্যগত মিল রয়েছে। এ ছাড়া একই দাবিতে ‘MCC News Tv’ নামের একটি ফেসবুক পেজেও ভিডিওটি পাওয়া যায়।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকায় ‘ছেলেকে বেঁধে মাকে ধর্ষণের অভিযোগ: ৫ আসামির বাড়িতে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে একটি পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে পাঁচ আসামির বাড়িতে বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে উপজেলার চরআলগী ইউনিয়নের চর কালীবাড়ি এলাকায় ঘটনাটি ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার পর পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী প্রথমে দুই আসামির বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করে। পরে আরও তিন আসামির বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
প্রতিবেদনে গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে আসামিদের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। বর্তমানে পুলিশ এলাকায় অবস্থান করছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্ত বাকি পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হয়। একই তথ্য পাওয়া যায় জাতীয় দৈনিক ‘সময়ের আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদনেও।
বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে ফ্যাক্টচেক টিম আজকের পত্রিকার গফরগাঁও উপজেলা প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি জানান, প্রচারিত দাবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া। এটি মূলত ধর্ষণে অভিযুক্তদের বাড়িতে এলাকাবাসীর অগ্নিসংযোগের ভিডিও। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী এবং আসামি উভয়পক্ষই মুসলিম। এ ছাড়া সম্প্রতি গফরগাঁওয়ে কোনো হিন্দু সম্প্রদায় বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড বা হামলার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ‘বাপ্পা সরকার' নামের অ্যাকাউন্টটি পর্যবেক্ষণে জানা যায়, এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে পরিচালিত হয়। এ ছাড় অ্যাকাউন্টটিতে বিভিন্ন সময়ে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর দাবিতে ভিডিও প্রচারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বাংলাদেশে ৩০-এর অধিক হিন্দু বাড়িতে আগুন দেওয়ার দাবিটি বানোয়াট। মূলত ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে আসামিদের বাড়িতে স্থানীয় জনতার দেওয়া আগুনের ভিডিওকে ভুয়া দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।