সংসদ সদস্যের (এমপি) সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে চাঁদা না পেয়ে এক ফার্মেসি দোকানিকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন মনির নামের এক বিএনপি নেতা—এমন দাবিতে একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
‘মোঃ ইয়াছিন খাঁন’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গত ২০ জুন আলোচিত দাবিতে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়, এই পোস্টটিই সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। ভিডিওটি আজ (২৩ জুন) দুপুর ১১টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৬৯ হাজার বারের বেশি দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটিতে ১ হাজার ১০০ রিয়েকশন, ১০৯ কমেন্ট ও ৩ হাজার ২০০ বার শেয়ার করা হয়েছে।
শেয়ার করা এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারী ঘটনাটিকে সত্য মনে করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং সরকারের তীব্র সমালোচনা করছেন।
ঘটনাটি কবে, কোথায় ঘটেছিল—সে সম্পর্কে পোস্টে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভিডিওতে ওষুধের দোকানের ভেতরে বসে থাকা এক ব্যক্তিকে দোকানের বাইরে থেকে এক ব্যক্তিকে চৌকাঠ দিয়ে দুইবার আঘাত করতে দেখা যায়। ওই আঘাতে চেয়ারে বসে থাকা ব্যক্তিটি ‘ওহ মাগো’ বলে চিৎকার করে মেঝেতে পড়ে যান।
অনুসন্ধানে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে আলোচিত দাবির পক্ষে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
তবে ‘Barta Meherpur’ নামের একটি ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ২৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিওর ১৭ থেকে ২৩ সেকেন্ডের দৃশ্যের সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর হুবহু মিল রয়েছে। ভিডিওতে কাউকে বলতে শোনা যায়, ‘বেশি বাড়িস না, বেশি বাড়িস না’। এরপর কয়েকজনকে সমস্বরে ‘শাহিন শাহিন’ বলতে শোনা যায়। একপর্যায়ে দোকানের ভেতর বসে থাকা ব্যক্তিকে এক ব্যক্তি চৌকাঠ দিয়ে আঘাত করেন।
‘Barta Meherpur’ পেজে প্রকাশিত ভিডিওর ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল গেটে মাইশা ফার্মেসির কর্মচারী শফিকুলের উপরে, সোনালী ফার্মেসীর মালিক শাহিন অতর্বিত হামলা করে গুরুতর আহত করে। বর্তমানে শফিকুল মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছে তার অবস্থা খারাপ হওয়ায় ডাক্তার তাকে রাজশাহী মেডিকেলে রেফার্ড করেছে।’ (লেখা ও বানান অপরিবর্তিত)। এ ছাড়া আরও কিছু (১ ,২ , ৩ ) পোস্টেও একই তথ্য পাওয়া যায়।
এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করে বিষয়টি নিশ্চিত হতে ফ্যাক্টচেক টিম আজকের পত্রিকার মেহেরপুর প্রতিনিধি রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে তিনি জানান, মেহেরপুরে মাইশা ফার্মেসির কর্মচারী মো. শফিকুল ইসলামকে (৩৫) লাঠি দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে সোনালী ফার্মেসির মালিক মো. শাহিন আহমেদের বিরুদ্ধে। গত শুক্রবার (১৯ জুন) মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের গেটের সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহত শফিকুল ইসলাম মেহেরপুরের গোপালনগর বাগানপাড়া গ্রামের মো. শাহাবুদ্দিনের ছেলে। শফিকুল ইসলাম বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাইশা ফার্মেসি ও সোনালী ফার্মেসি একই গলিতে মুখোমুখি দোকান। মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল থেকে রোগী বের হয়ে গেটের সামনে এলে মাইশা ফার্মেসির কর্মচারী শফিকুল ইসলাম ওষুধ নেওয়ার জন্য ওই রোগীকে ডাকেন। এই রোগী ডাকাডাকিকে কেন্দ্র করে শফিকুল ইসলাম ও শাহীন আহমেদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দোকানে বসে থাকা শফিকুল ইসলামকে চৌকাঠ দিয়ে কানের ওপর আঘাত করেন শাহিন আহমেদ। শফিকুল ইসলামকে গুরুতর অবস্থায় মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
শফিকুল ইসলামের মা সুফিয়া বেগম বলেন, আমি লোকের মুখে শুনেছি আমার ছেলেকে মেরেছে। কষ্ট হবে বলে আমি ভিডিওটাও দেখতে পারিনি। পরে দেখলাম আমার ছেলে এমন ভাবে মেরেছে যা সহ্য করা কঠিন। আমার ছেলের যে কী হবে আল্লাহ ভালো জানেন! রোগী ডাকাকে কেন্দ্র করে এত বড় ঘটনা ঘটাবে কেউ ভাবেনি। আমাদের পরিবারে একমাত্র আয়ের উৎস আমার সন্তান। এখন সে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। তার দুটি ছোট সন্তান আছে। এখন আমি পরিবার চালাব কীভাবে আর ছেলের চিকিৎসা করাব কীভাবে কিছুই বুঝতে পারছি না!
মেহেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির জানান, এই ঘটনায় আহত শফিকুল ইসলামের পরিবার থানায় মামলা করেছে। ঘটনার পর থেকে আসামি পলাতক। তাঁকে আটকের চেষ্টা করছে পুলিশ।
এমপির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের চাঁদা না পেয়ে ওষুধের দোকানিকে পিটিয়ে হত্যার দাবিটি বানোয়াট। মূলত মেহেরপুরে রোগী ডাকাডাকিকে কেন্দ্র করে এক ওষুধের দোকানের কর্মচারী আরেক দোকানের মালিককে মারধরের ঘটনার ভিডিও এটি।