হোম > ফ্যাক্টচেক > দেশ

ফরিদপুরে নেশার টাকা না দেওয়ায় মাকে হত্যার দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

ফরিদপুরে মাকে কুপিয়ে হত্যার দাবিতে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

‘ফরিদপুরে নেশার টাকা না দেওয়ায় মাকে কুপিয়ে হত্যা করল ছেলে’—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

‘DTV’ নামের একটি ফেসবুক পেজে শেয়ার করা ভিডিওটি ইতিমধ্যে এক লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। পোস্টটিতে হাজারের বেশি রিঅ্যাকশন ও কমেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। পোস্টটির কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কেউ ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ দাবি করেছেন, ঘটনাটি ভারতের।

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

আলোচিত দাবি ও ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ের শুরুতে ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। ৪৬ সেকেন্ডের ভিডিওটির প্রথম ১৫ সেকেন্ডে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক নারীকে আঘাত করতে দেখা যায়। পরে ওই যুবককে অস্ত্র হাতে বসে থাকতে দেখা যায়।

তবে ভিডিওটির প্রথম অংশে শোনা ভাষার সঙ্গে দেশীয় ভাষার মিল পাওয়া যায়নি। অন্য দিকে, ভিডিওর ১৬ থেকে ৪৬ সেকেন্ড পর্যন্ত অংশের কথাবার্তা, পারিপার্শ্বিক স্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাকের সঙ্গে দেশীয় ভাষা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকের মিল রয়েছে।

এ ছাড়া, ভিডিওটির প্রথম অংশে নারীকে আঘাত করার স্থান এবং তাঁর পরনের পোশাকের সঙ্গে পরবর্তী অংশে নারীর নিথর দেহ পড়ে থাকা স্থান ও পরনের পোশাকের অমিল পাওয়া যায়। ফলে ভিডিওটির দুই অংশ একই ঘটনার কি না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়।

পরে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড নিয়ে অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনের দৃশ্যের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওটির ১৬ থেকে ৪৬ সেকেন্ডের অংশের সাদৃশ্য পাওয়া গেলেও প্রথম ১৫ সেকেন্ডের দৃশ্যের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।

এটিএন নিউজের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

এটিএন নিউজের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফরিদপুরে মাকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত যুবকের নাম আব্দুর রহিম। তবে প্রতিবেদনে থাকা আব্দুর রহিমের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর প্রথম অংশে দেখা যুবকের চেহারা ও শারীরিক গঠনের মিল নেই।

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এ ‘ফরিদপুরে নেশার টাকা না পেয়ে মাকে হত্যা’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। গত ৩০ জুলাই প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফরিদপুর পৌরসভার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বায়তুল আমান এলাকায় নেশার টাকা না দেওয়ায় সাহেলা বেগম (৫০) নামের এক নারীকে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁর ছেলে আব্দুর রাহিম শেখের বিরুদ্ধে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আব্দুর রাহিম দীর্ঘদিন ধরে নেশায় আসক্ত ছিলেন এবং নেশার টাকার জন্য প্রায়ই মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। ঘটনার দিন নেশার টাকা চেয়ে না পেয়ে ধারালো বঁটি দিয়ে মাকে আঘাত করার পর লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পরে তিনি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। একই বিষয়ে জাতীয় দৈনিক ‘যুগান্তর’-এও প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

যুগান্তর ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

অন্য দিকে, ভাইরাল ভিডিওটির প্রথম ১৫ সেকেন্ডের দৃশ্য নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ‘Jhapa News TV’ নামের ফেসবুক পেজে শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। গত ২৪ জুলাই শেয়ার করা ওই ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর মিল পাওয়া যায়। ওই ভিডিওর ক্যাপশনে নেপালি ভাষায় বলা হয়, নেপালের রৌতহট জেলার গুজরা পৌরসভা-৫-এর হরিহরপুরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এক নারী নিহত হয়েছেন। ঘটনার পর অভিযুক্ত এক যুবককে ঘটনাস্থলে খুকুরি (দা) হাতে বসে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে নেপাল পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় তাঁকে আটক করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে বলেও ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘Nepali Trends’ নামের ফেসবুক পেজে শেয়ার করা ভিডিও থেকেও প্রায় একই তথ্য পাওয়া যায়।

নেপালের ঘটনা বলে ফেসবুক পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

তবে ভাইরাল ভিডিওর প্রথম অংশটি নেপালের কি না, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও অনুসন্ধানে The Himalayan Times-এর একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি নেপালের এবং নিহত নারীর নাম রেণু দেবী জয়সোয়াল (৪৫)। তিনি গুজরা পৌরসভা-৫-এর হরিহরপুরের বাসিন্দা। পুলিশ জানায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খুকুরি দিয়ে হামলা চালানো হলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ছাড়া, অভিযুক্ত হামলাকারীর নাম উপেন্দ্র সাহ কলওয়ার (৩৫)। তিনি মূলত বারার কারাইয়ামাই গ্রামপালিকে-৮-এর বাসিন্দা।

দ্য হিমালয়ান টাইমসের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

সিদ্ধান্ত

ফরিদপুরে নেশার টাকা না দেওয়ায় মাকে হত্যার দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর। অর্থাৎ, ফরিদপুরে নেশার টাকা না দেওয়ায় মাকে হত্যার দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির প্রথম ১৫ সেকেন্ডের দৃশ্যটি বাংলাদেশের নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com