হোম > ফ্যাক্টচেক > বিদেশ

দিল্লিতে ইরানি প্রেসিডেন্টের ভিডিও ভাইরাল, তিনি কি হিন্দু গুরুর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিয়েছেন

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান হিন্দু ধর্মীয় নেতার পা ছুঁয়েছেন—এমন দাবিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন । ছবি: স্ক্রিনশট

সম্প্রতি ভারতের নয়াদিল্লিতে শেষ হয়েছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি সফরের সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এক হিন্দু গুরুর সামনে ঝুঁকে পড়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হচ্ছে, তিনি ওই গুরুর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিয়েছেন।

‘thebasedindian’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হয়, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের একজন হিন্দু ধর্মগুরুর পা স্পর্শ করে আশীর্বাদ নেওয়ার দৃশ্যটি বিনয়, শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক সম্প্রীতির এক সুন্দর মুহূর্ত।

এ ছাড়া ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্থান টাইমসের বাংলা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই দাবিতে ফটোকার্ড শেয়ার করা হয়েছে।

আলোচিত দাবিতে পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পেজেশকিয়ানকে গেরুয়া বসন পরিহিত এক ধর্মীয় নেতার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসিমুখে ওই আধ্যাত্মিক নেতার হাত ধরে ছিলেন। পরে তাঁকে মাথা ঝুঁকে নিচু হতে দেখা যায়। কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ও গণমাধ্যমে এই দৃশ্যকে পেজেশকিয়ানের ধর্মগুরুর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেওয়ার দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধানে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ‘ইসমাত টিভি’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ভিডিওটির দীর্ঘ সংস্করণ পাওয়া যায়। ওই ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়, ওই পুরোহিতকেও পড়ে যাওয়া জিনিসটি তুলতে নিচু হতে দেখা যায়। পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলোর প্রতি অতিথিদের সম্মান দেখানো এবং তাঁদের নিয়ে বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর বর্ণনা না ছড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।

ভিডিওটির ভেতরে থাকা লেখাতেও বলা হয়, ‘সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে ঘটনাটির একটি বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কলম মাটিতে পড়ে গেলে সেটি তুলতে পুরোহিতও নিচু হন। প্রেসিডেন্টও সৌজন্য ও সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে প্রথমে সেটি তোলার চেষ্টা করেন।’ অর্থাৎ, এটি কোনো ব্যক্তির সামনে প্রেসিডেন্টের আশীর্বাদ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ঝুঁকে পড়ার ঘটনা নয়।

এ ছাড়া, ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে ভিড়ের মধ্যে পেজেশকিয়ান ও হিন্দু গুরু দুজনকেই হাসিখুশি অবস্থায় দেখা যায়। এ সময় তাঁদের নিজেদের মধ্যে এবং অন্যদের সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায়। ভিডিওর একপর্যায়ে প্রথমে পেজেশকিয়ান এবং এর কিছুক্ষণ পর ওই ধর্মীয় নেতাকে কিছু একটা তুলতে নিচু হতে দেখা যায়।

এক্স পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওতে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে থাকা ব্যক্তি হলেন জগদগুরু স্বামী সতীশাচার্য মহারাজ। তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের কানপুরের কল্যাণপুরে অবস্থিত প্রেমেশ্বর ধামের পীঠাধীশ্বর। তাঁর অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক অ্যাডমিন পোস্টে বলা হয়েছে, ‘ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ভারতের পবিত্র ভূমিতে আন্তরিক স্বাগত ও অভিনন্দন। এই মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে সনাতন সংস্কৃতির অন্যতম মহান স্তম্ভ, বেদের প্রণেতা ও প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক গুরু জগদগুরু স্বামী সতীশাচার্যজি মহারাজের পবিত্র উপস্থিতি এই সংলাপকে বৈশ্বিক ও আধ্যাত্মিক পর্যায়ে একটি ঐতিহাসিক মাত্রা দিয়েছে। পাশাপাশি ধর্ম সংসদের সভাপতি মহামণ্ডলেশ্বর গোস্বামী সুশীলজি মহারাজ, পতঞ্জলি যোগপীঠের এবং যোগ ও আয়ুর্বেদের পথিকৃৎ আচার্য বালকৃষ্ণজি মহারাজসহ দেশ-বিদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে সন্ধ্যাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।’ তবে সেখানে কোথাও আলোচিত দাবির বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ভারতীয় গণমাধ্যম News18 এর প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাইরাল ভিডিও নিয়ে ছড়ানো ব্যাখ্যাটি ভারতে ইরানি দূতাবাসের সূত্র প্রত্যাখ্যান করেছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ান ওই নেতার পা ছোঁননি। বরং অন্য একজন নেতা পেজেশকিয়ানকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। চিঠিটি অসাবধানতাবশত তাঁর হাত থেকে পড়ে যায়। এরপর ইরানের প্রেসিডেন্ট সেটি তুলতে ঝুঁকে যান। এটি কোনো ব্যক্তির সামনে প্রেসিডেন্টের আশীর্বাদ নেওয়ার ঘটনা নয়।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ান ও জগদগুরু স্বামী সতীশাচার্য মহারাজের মধ্যে কথোপকথনের সময় ধারণ করা ভিডিওটি অসম্পূর্ণ বা সম্পাদিতভাবে প্রচার করায় ঘটনাটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট আড়াল হয়েছে।

এ ছাড়া ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনেও আলোচিত দাবিটিকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ান ধর্মগুরুর পা ছোঁয়ার জন্য ঝোঁকেননি; বরং পড়ে যাওয়া একটি চিঠি তুলতে তিনি নিচু হয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থানকালে ইরান দূতাবাসের আয়োজনে এক সুধী সমাবেশে অংশ নেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে সঙ্গে নিয়ে নয়াদিল্লির ‘দ্য ওবেরয়’ হোটেলে ভারতীয় ধর্মীয় নেতা, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক পটভূমির মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই সাক্ষাৎকারটি ছিল পেজেশকিয়ানের ভারত সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম WION-এর মতে, এই ধরনের উদ্যোগ মূলত ভারতের সঙ্গে ইরানের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।

সিদ্ধান্ত

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দিল্লিতে হিন্দু গুরুর নেতার পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিয়েছেন—এমন দাবিটি সঠিক নয়। মূলত, পেজেশকিয়ানের হাত থেকে পড়ে যাওয়া চিঠি বা কাগজের টুকরো তুলতে নিচু হওয়ার ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com