নেপালে দুর্যোগের তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচিত দাবিতে ফেসবুকে অন্তত ১০-এর অধিক ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ‘Seuli Dutta’ নামের একটি পেজ থেকে শেয়ার করা ভিডিওটি। ১ সেপ্টেম্বর শেয়ার করা ভিডিওটি আজ (২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টা পর্যন্ত ৪ লাখ ৩ হাজারেরও বেশি বার দেখা হয়েছে এবং এতে ২০ হাজার ৭০০ রিয়েকশন, ৩৩২ কমেন্ট ও ৬৬১ শেয়ার রয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোর কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ নেটিজেন ভিডিওটিকে নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা মনে করেছেন।
ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গর্তের ভেতর আটকে থাকা এক শিশুকে জুস পান করানো হচ্ছে। পরে উদ্ধারকর্মী ও আশেপাশের লোকজন মিলে শিশুটিকে গর্ত থেকে বের করে নিয়ে আসে।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় (১, ২, ৩, ) ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘তিন দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর নেপালে ৬ বছরের শিশু উদ্ধার’ কিংবা ‘নেপালে ৬০ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত শিশু উদ্ধার’ শিরোনামে একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা তিন দিন আটকে থাকা ছয় বছরের এক কন্যাশিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। গত বুধবার (২৬ আগস্ট) বন্যা ও ধসে ভোতে কোশি নদীর কাদা ও পাথরের ঢলে তলিয়ে যায় রাসুয়া জেলার তিমুড়ে গ্রাম। শুক্রবার (২৯ আগস্ট) সেখানে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় মাটির নিচ থেকে ক্ষীণ কান্নার শব্দ শুনতে পান নেপালের আর্মড পুলিশ ফোর্সের (এপিএফ) সদস্যরা।
এ সময় দ্রুত মাটি খুঁড়ে তাঁরা শিশুটিকে নিরাপদে বের করে আনেন। পরে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া ওই শিশুকন্যার নাম মনিষা মগার। শুরুতে তাকে স্থানীয় তিমুড়ে সীমান্ত চৌকিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রচারিত প্রতিবেদনগুলোতে থাকা ছবি কিংবা ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক ভাইরাল ভিডিওটির কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ‘newsly.india’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট পাওয়া যায়। চলতি বছরের ১৬ মে শেয়ার করা ওই ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর মিল রয়েছে। পোস্টটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ভারতের পাঞ্জাবের হোশিয়ারপুর জেলার চাক সামানা গ্রামে চার বছর বয়সী এক শিশু দুর্ঘটনাবশত একটি খোলা বোরওয়েলে বা একটি কুয়ায় পড়ে প্রায় ৩০ ফুট গভীরে আটকে যায়। পরে পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয়দের প্রায় নয় ঘণ্টার যৌথ অভিযানে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।
এই সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার ফেসবুক পেজে শেয়ার করা আরও একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যার সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির হুবহু মিল রয়েছে।
এ ছাড়া, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটে ইংরেজি ভাষায় ‘৪ বছরের শিশুকে পাঞ্জাবে ৯ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর কুয়া থেকে নিরাপদে উদ্ধার’ শিরোনামের গত ১৬ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য থেকে ঘটনাটির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
প্রতিবেদন বলা হয়, ভিডিওটি নেপালের নয়; বরং ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের হোশিয়ারপুরের চাক সামানা গ্রামের। সেখানে খেলতে গিয়ে গুরকারান সিং নামের ৪ বছর বয়সী এক শিশু ২০-৩০ ফুট গভীর এক খোলা বোরওয়েলে পড়ে যায়। পরবর্তীতে এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রায় ৯ ঘণ্টার দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান শেষে শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া আরও কিছু ভারতীয় গণমাধ্যম থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো—নেপালে ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশু উদ্ধার এবং ভারতের বোরওয়েল থেকে শিশু উদ্ধারের দুটি ঘটনাই সত্য হলেও, ভিডিওর স্থান, উদ্ধার হওয়া শিশুর নাম, বয়স এবং পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপটের সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
উল্লেখ্য, আজ বুধবার সকাল পর্যন্ত নেপালে ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যা, ভূমিধস ও কাদাধসের কারণে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ১২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৫৮ জনে।
নেপালে ধ্বংসস্তূপের নিচে ৩ দিন আটকে থাকার পর জীবিত শিশু উদ্ধারের দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর। মূলত ভারতের পাঞ্জাবে বোরওয়েলে পড়ে যাওয়া শিশুকে উদ্ধারের পুরোনো এক ভিডিও ক্লিপকে নেপালের ঘটনা দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে।