‘শেখ হাসিনা আমার মাতৃত্যুল্যা। ভারতে থাকতে তার কোন স্ট্যাটাস প্রয়োজন নেই’—ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেস পার্টির সংসদ সদস্য রাহুল গান্ধীকে উদ্ধৃত করে এমন একটি উক্তি সংবলিত ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচিত দাবিতে কয়েকটি পোস্ট রয়েছে এখানে, এখানে এবং এখানে।
‘The Bengal Brief’ নামের ফেসবুক পেজে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে, যা আলোচিত দাবিতে সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। গতকাল শেয়ার করা ফটোকার্ডটিতে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ রিয়েকশন রয়েছে। এ ছাড়া পোস্টটিতে ১৬৭ কমেন্ট ও ১৭৯ শেয়ার রয়েছে।
পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায় অধিকাংশ ব্যাবহারকারী ফটোকার্ডটিকে সত্য মনে করেছেন।
একজন কমেন্ট করেছেন, ‘গান্ধী পরিবারের কংগ্রেসের এই বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা রাহুল গান্ধীকে শুধু ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। তাঁর প্রতি রইল অনেক অনেক দোয়া ও আশীর্বাদ। আজকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে তিনি যে বাক্যগুলো উচ্চারণ করেছেন, সেগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাঁকে জানাই হাজারও স্যালুট। জয় বাংলা। আই লাভ ইউ, ব্রাদার।’
অপর একজন বলেন, ‘গান্ধী পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের বন্ধন—সেটা আবারও প্রমাণিত হলো। ধন্যবাদ। জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু।’
প্রচারিত ফটোকার্ডটিতে রাহুল গান্ধী কবে বা কোথায় এমন কথা বলেছেন, তার কোনো তথ্য নেই। তবে ফটোকার্ডের নিচে সূত্র হিসেবে ‘প্রতিদিনের সংবাদ’-এর নাম রয়েছে।
এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করে ‘দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে একই ফটোকার্ড পাওয়া গেলেও, সেখানে রাহুল গান্ধীর আলোচিত মন্তব্যের কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ নেই। এ ছাড়া অনুসন্ধানে ‘Headlines Tripura National’ নামে ভারত থেকে পরিচালিত ফেসবুক পেজেও আলোচিত দাবিতে একটি পোস্ট পাওয়া যায়। তবে ওই পোস্টেও কোনো উৎসের উল্লেখ নাই।
অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ভারতীয় গণমাধ্যম ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এ প্রকাশিত ‘Bangladesh crisis: What Rahul Gandhi said in S Jaishankar’s all-party meeting’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের নেতৃত্বে একটি সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাহুল গান্ধীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। বৈঠকে রাহুল গান্ধী বাংলাদেশের পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর পড়তে পারে কি না, তা জানতে চান। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহে কোনো বিদেশি শক্তির ভূমিকা রয়েছে কি না এবং দেশটির সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে সেখানে শেখ হাসিনা ‘মাতৃতুল্য’, ‘ভারতে থাকতে তাঁর স্ট্যাটাস লাগবে না’— এ ধরনের কোনো কথা সেই প্রতিবেদনে নেই।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে বাংলাদেশে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং সরকারে যে-ই থাকুক না কেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় থাকবে। সেই বক্তৃতাতেও আলোচিত দাবির মতো কোনো ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মন্তব্যের কথা পাওয়া যায়নি।
এদিকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে জাতীয় দৈনিক ‘সময়ের আলো’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ এখনো নিশ্চিতভাবে জানে না শেখ হাসিনা ভারতে ঠিক কোন মর্যাদা বা স্ট্যাটাসে অবস্থান করছেন। গত ১৭ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এ কথা জানান।
তিনি বলেন, ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ভারতীয় আদালতের অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে তিনি ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন কি না বা তাঁর সুনির্দিষ্ট স্ট্যাটাস কী—তা পরিষ্কার করা হয়নি। আমিনুল ইসলাম আরও জানান, শেখ হাসিনা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে।
উল্লেখ্য, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে থেকে শেখ হাসিনা ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি দিল্লিরই কোনো এক স্থানে থাকছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
‘শেখ হাসিনা আমার মাতৃতুল্য, ভারতে থাকতে তাঁর কোনো স্ট্যাটাস প্রয়োজন নেই’—রাহুল গান্ধীর নামে প্রচারিত এই উক্তির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোনো তথ্যসূত্র ছাড়াই রাহুল গান্ধীর নামে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে।