২০২২ সালকে বিদায়। ২০২৩ সালকে স্বাগত জানিয়ে নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা কী? আমরা চাই সবকিছু ভালো হোক, ভালোভাবে চলুক। কিন্তু প্রত্যাশার বাইরে অনেক সময় অনেক কিছু ঘটে যায়। এ কারণে হতাশা আসে আবার প্রত্যাশারও শেষ হয় না। ২০২২ সালের শুরুতে আমরা কোভিড-১৯ থেকে বের হয়ে এসেছি। ২০২০-২১ সালের করোনা মহামারির সংকটকালে আমাদের সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্বের অনেক দেশ থেকে ভালো ছিল। আমাদের আশা ছিল, ২০২২ সালে অবস্থার আরও উন্নতি হবে এবং আমাদের সাফল্যগুলো আরও সংহত করা যাবে। কিন্তু ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অপ্রত্যাশিতভাবে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়া আক্রমণ করায় আবার সবকিছু ওলট-পালট হতে শুরু করে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পরিকল্পনা ছিল এক সপ্তাহের মধ্যে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখল করে, রাশিয়ার সমর্থিত একটা সরকার প্রতিষ্ঠা করে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন। অনেক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞও ভেবেছিলেন, যুদ্ধটা দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু পরিকল্পনার বিপরীত ঘটনা ঘটতে থাকে। ২০২২ সালের শেষে এসেও দেখা যাচ্ছে যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। এই যুদ্ধের ফলে ইউরোপজুড়ে শুধু নয়, সমগ্র বিশ্বে অর্থনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, সরবরাহব্যবস্থা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেক দেশ এখন অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও মন্দার সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশও এসব থেকে রক্ষা পায়নি। যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর চাপ পড়েছে। যেহেতু এ খাতটি মূলত আমদানিনির্ভর, সে কারণে বছরের শুরুতে যেখানে ৪৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ছিল, সেটা বছরের শেষ দিকে প্রায় ৩৩ বিলিয়নে নেমে আসে। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে বাধার সম্মুখীন হলাম।
রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধে দুই দেশের হতাহতের সংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়িয়ে গেছে। ফলে দুই দেশই ভীষণভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ যুদ্ধে এমন সব মারণাস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। যেমন হাইপারসনিক মিসাইল ও ড্রোনের ব্যবহার। হাইপারসনিক হলো শব্দ থেকে সাত গুণের বেশি গতিসম্পন্ন মিসাইল, যা বহু দূর থেকে নিক্ষেপ করা যায়। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আঘাত হানা হচ্ছে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে। এতে প্রচুর লোক মারা পড়ছে। এত দিন পর্যন্ত ট্যাংককে ‘কিংক অব ব্যাটেল’ বলা হতো। সেই ট্যাংকের বিরুদ্ধে যখন ড্রোন হামলা হতে থাকল, তখন কিন্তু ট্যাংকের সক্ষমতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। একইভাবে মানুষচালিত যুদ্ধবিমানের জায়গা দখল করেছে ড্রোন। ফলে স্বল্প ক্ষমতাধর একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে পারছে। রাশিয়া পরাশক্তি না হলেও প্রায় পরাশক্তির সমান ক্ষমতা থাকার পরেও যুদ্ধক্ষেত্রে তারা কিন্তু ততটুকু সুবিধা করতে পারছে না।
আমরা মনে করেছিলাম স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পরে পৃথিবীতে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করবে, সেটা এখন মনে হচ্ছে সুদূর পরাহত। কারণ, পৃথিবী একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব, অন্যদিকে রাশিয়া-চীন মিলে আরেকটা অক্ষ শক্তির সৃষ্টি হয়েছে, সেটা ভবিষ্যতে আরও দ্বন্দ্বময় বিশ্বের সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটা বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। দারিদ্র্যপীড়িত দেশের জন্য যেসব সাহায্য একসময় উন্নত দেশগুলো থেকে আসত, সেগুলো এখন সামরিকায়নের জন্য ব্যয় হচ্ছে।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে বলতে হয়, বঙ্গোপসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে ধীরে ধীরে চীন ও পশ্চিমা বিশ্ব ক্রমেই একটি শক্তির পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। এ অঞ্চলটা এমনিতেই ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরাশক্তির দিক থেকে চীন একটা উদীয়মান শক্তি। এই শক্তিটা বাইরের ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্বালানি আমদানিনির্ভর একটা দেশ। তাদের সব জ্বালানি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল যে চীনে যাবে, এ জন্য তাদের বঙ্গোপসাগর, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর ব্যবহার করতে হবে। আর এখন সবগুলো শিপমেন্ট যাচ্ছে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে। এই কারণে এ অঞ্চলটাকে চীন এবং পশ্চিমা বিশ্ব তাদের প্রভাববলয় বিস্তার করতে চাইছে। পশ্চিমারা চেষ্টা করছে চীন যেন এ অঞ্চলে তার প্রভাববলয় বিস্তার করতে না পারে।
সম্প্রতি আমরা দেখেছি, ভারত-চীন সীমান্তে সংঘর্ষের ঘটনা। কারণ, কয়েক হাজার মাইল সীমান্ত নিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনের বিরোধ রয়েছে; বিশেষ করে বাংলাদেশের অতি সন্নিকটে অরুণাচল প্রদেশের এক অংশের দাবিদার চীন। অরুণাচল ভারতের একটা রাজ্য। যদি এই সীমান্তে ভবিষ্যতে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, তাহলে আমাদের দেশের জন্য সমস্যা হতে পারে। কারণ, চীন ও ভারতের সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। তাদের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক দাঁড়ালে তা আমাদের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
তবে আশার বিষয় এই, সংঘর্ষ হলে ভারত ও চীন উভয়ে জানে, তারা পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল। এই মুহূর্তে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার তাদের ব্যবসা। যে ব্যবসাটা চীনের পক্ষে; অর্থাৎ চীন অনেক বেশি ভারতে রপ্তানি করে এবং সেই তুলনায় ভারত খুব কম রপ্তানি করে। তাই চীন কখনোই চাইবে না ভারত তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াক।
এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হলো—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত এই পররাষ্ট্রনীতি আমরা আজও অনুসরণ করে আসছি।
আর আমরা সুবিধাজনক অবস্থায় আছি এই দিক থেকে যে, আমাদের সীমান্ত আছে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে। উভয় দেশের স্থল সীমান্ত চিহ্নিত এবং সব পক্ষ তা মেনে নিয়েছে। আমাদের একটা অনির্ধারিত সমুদ্র সীমান্ত ছিল, সেটাও কয়েক বছর আগে চিহ্নিত এবং মীমাংসা হয়ে গেছে। আমরা যেটা দেখি, আফ্রিকা ও এশিয়ার বেশ কিছু দেশ, বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে এসেছে, তাদের প্রায় প্রতিটি দেশের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ লেগেই আছে। সে দিক দিয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। ভারতের সঙ্গে আমাদের কোনো বৈরী সম্পর্ক নেই। মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো সীমান্ত বিরোধ না থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে। মিয়ানমার তাদের একটা অভ্যন্তরীণ সমস্যা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
মিয়ানমারের অবস্থান পৃথিবীবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে যে ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল, তা পাওয়া যায়নি। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের কাছে বাঁচা-মরার সমস্যা হলেও বিশ্ববাসীর কাছে তা বড় সমস্যা হয়তো নয়।
আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চেষ্টা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ বজায় রাখার।
আমাদের অর্থনৈতিক স্থবিরতা আছে, শিক্ষিত বেকার বাড়ছে, চাকরির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। আবার কোভিডের পর নতুন করে দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে। নতুন বছরে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—এসব সমস্যা অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখাটাও জরুরি। বিদায়ী বছরের শেষ দিকে এসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, তা আমাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। নতুন বছরে দেশের রাজনীতি আবর্তিত হবে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে। দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো সংঘাতের পথ পরিহার করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখবে এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হবে—এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা।
শিক্ষাব্যবস্থার একটা বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আছে। কারণ, পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো করতে গেলে একটা শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী আমাদের লাগবে। শুধু সনদধারী যুবসমাজ নয়, যদি প্রকৃত শিক্ষিত যুবসমাজ গড়ে তোলা যায়, তাহলেই সামনের পৃথিবীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে। বাংলাদেশের যখন উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশে উত্তরণ ঘটছে, তখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো আরও বাড়বে।
অতীতে আমরা যেমন অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনে এগোতে পেরেছি, তেমনি ২০২৩ সালেও আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব। নতুন বছর সবার ভালো কাটুক। সবাইকে খ্রিষ্টীয় নতুন বছরের শুভেচ্ছা।
লেখক: এয়ার কমোডর (অবসরপ্রাপ্ত)