পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশ। অথচ স্বাধীনতার ৫১ বছর পরও বেদনার সঙ্গে বলতে হচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটেনি, বরং প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে।
১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। এই দিনে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরাজয় বরণ করে আত্মসমর্পণ করেছিল যৌথ বাহিনীর কাছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে আমরা পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। বিজয়ের এই দিনের স্মৃতি আমার জীবনস্মৃতির সর্বোত্তম স্মৃতিরূপে আজও জাজ্বল্যমান। মনে পড়ে এই দিনটির কথা।
আমি তখন পুরানা পল্টন লেনে দাদার বাড়িতে। দাদাবাড়ির লাগোয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি, যেটি অঞ্জলিদের বাড়ি নামে কথিত ছিল। প্রাণ রক্ষার্থে তারা পুরো পরিবার দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে গিয়েছিল। ফাঁকা সেই বাড়িতে দখলদার রূপে জনৈক পাঠান দরিয়া খান জেঁকে বসে। দরিয়া খানের দখলে ৯ মাস ছিল বাড়িটি। ১৬ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় দুজন অবাঙালি যুবক সাইকেলে চেপে ছুটে আসেন দরিয়া খানের কাছে। তাঁদের চোখে-মুখে শঙ্কা-ভয়-আতঙ্ক। দরিয়া খানকে ডেকে অল্প সময়ে কিছু কথা চুপিচুপি বলে দ্রুত কেটে পড়েন। দরিয়া খানও কালবিলম্ব না করে তাঁর লুণ্ঠিত মোটরসাইকেল ও মালামাল ফেলে অঞ্জলিদের বাড়ি ত্যাগ করে। দুই বাড়ির সীমানার বেড়ার ফাঁক দিয়ে আমরা তাঁদের দেখছিলাম।
সময় গড়িয়ে দুপুরের পর চারদিকে রটে যায়—নিয়াজি আত্মসমর্পণ করছেন। আগের রাতে আকাশবাণী থেকে প্রচারিত দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠকৃত কথিকাটির কথা মনে পড়ে গেল। মনে পড়ল নিয়াজির দেওয়া শর্ত বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে নয়, ভারতীয় বাহিনীর কাছেই তাঁরা আত্মসমর্পণে সম্মত আছেন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কি তাঁর শর্ত মেনে নিয়েছে? স্বাধীনতার সীমাহীন উত্তেজনায় আর বাড়িতে থাকা সম্ভব হয়নি। শীতের সেই অপরাহ্ণের পূর্বেই বেরিয়ে পড়ি। বিজয়নগরের রাস্তা ধরে গুলিস্তান অভিমুখে যাওয়ার সময় দেখি উৎফুল্ল প্রচুর মানুষ রাস্তায় উল্লাস প্রকাশ করছে। রাস্তার পাশে গুলিতে পড়ে থাকা মৃত মানুষের লাশ ঘিরে মানুষ জটলা করে আছে। হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে যাওয়ার সময় উৎফুল্ল নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি ছোড়ে। বিজয়নগর থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত বেশ কিছু লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি, যাঁরা হানাদারদের সর্বশেষ শিকারে প্রাণ হারিয়েছেন। বিজয় উল্লাসে রাস্তায় বের হয়ে আসা মানুষের ওপর চলন্ত গাড়ি থেকে নির্বিচারে গুলি করে পাকিস্তানি বাহিনী। বিজয় মুহূর্তে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া মানুষের লাশ আমাকে বিষণ্ন করে তোলে। মিত্রবাহিনীর সাঁজোয়া যান দেখে মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে ছুটে গিয়ে আলিঙ্গন-করমর্দন করে তাঁদের সঙ্গে। আমিও জনতার সঙ্গে ছুটে গিয়ে হাত মেলাই, কোলাকুলি করি। তাঁদের অভিনন্দন জানাই।
গুলিস্তান থেকে সোজা পূর্ব দিকে সাবেক গভর্নর হাউসের (বর্তমান বঙ্গভবন) পাশ ধরে টিকাটুলী হয়ে কখন যে সায়েদাবাদে চলে এসেছি, টেরই পাইনি। ওই পথ দিয়েই মিত্রবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ির বহর ঢাকায় প্রবেশ করছিল। সংবিৎ ফিরে এলে উৎফুল্ল জনতার অভিনন্দনে একটি মিত্রবাহিনীর সামরিক ট্রাক থামে। আমি চটজলদি সেই ট্রাকে উঠে পড়ি। আমাকে মিত্রবাহিনীর সদস্যরা বাধা না দিয়ে সঙ্গী করেন। বর্তমান মৎস্য ভবনের কাছে এসে ট্রাক থামলে নেমে পড়ি এবং দ্রুত রেসকোর্সের দিকে এগিয়ে যাই। অজস্র মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের আত্মসমর্পণ দেখছিল। তবে আমাদের কাউকে রেসকোর্সের ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা বেষ্টনী দিয়ে রেখেছিলেন।
আত্মসমর্পণের দৃশ্য দূর থেকে দেখে ফিরে আসি পুরানা পল্টন লেনের দাদাবাড়িতে। আমার দেখা এই ঘটনা অন্যদের কাছে সবিস্তারে জানাই। শোনার সময় কেউ কিছু না বললেও শোনার পর আমার প্রাণ সংহারের আশঙ্কায় তিরস্কার কিন্তু শুনতে হয়েছিল। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির উত্তেজনায় সেই তিরস্কার আমাকে সেদিন বিন্দুমাত্র স্পর্শ করেনি।
পরদিন সকালে জানতে পারি রায়েরবাজারে অগণিত মৃত মানুষের স্তূপের সংবাদ। তখন ঘণ্টায় সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত। তেমন একটি দোকান ছিল পুরানা পল্টন লেনে। আমাকে চেনে বলে সহজেই ভাড়ায় সাইকেল নিয়ে কাউকে না জানিয়ে সেই সাইকেলে চেপে রায়েরবাজারের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী ইটের ভাটাসংলগ্ন স্থানে গিয়ে দেখি অগণিত মানুষ, যারা পচা দুর্গন্ধ উপেক্ষা করে স্বজনদের শনাক্তের জন্য লাশের স্তূপ হাতড়াচ্ছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইটের স্তূপের পাশে অগণিত পচা-গলা লাশ। বিকৃত চেহারার কারণে চেনারও উপায় নেই। আলবদর, রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে ধরে এনে দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ নিরপরাধ মানুষদের নৃশংস নির্যাতনে হত্যা করে, এটি তাঁদেরই লাশের স্তূপ। স্বজনদের আহাজারি-ক্রন্দন, লাশ খোঁজার সেই দৃশ্য আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। অনেকে দুর্গন্ধে নাকে-মুখে কাপড় জড়িয়ে লাশ টেনে টেনে স্বজনদের খুঁজছে। অনেকের নাকে-মুখে কাপড়ও নেই। বেহুঁশের মতো তাঁরা চিৎকার করে কাঁদছেন আর স্বজনদের খুঁজে চলেছেন। মর্মান্তিক সেই দৃশ্য দীর্ঘক্ষণ দেখা সম্ভব ছিল না। একসময় সাইকেল নিয়ে একরকম পালিয়ে সেই নৃশংস স্থান ত্যাগ করি।
সেই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে তিন দিন কিছু খেতে পারিনি। রাতে ঘুম থেকে হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠেছি। সেই স্মৃতি আমাকে সহজে ছাড়েনি। অনেক দিন তাড়িয়েছে। বিজয়ের আনন্দকে এই বর্বরোচিত নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা বিষাদে পরিণত করেছিল। সেই ভয়ংকর স্মৃতি বিগত ৫১ বছর আমাকে আবেগে আপ্লুত করে এসেছে। আজও চোখ বুজলে সেই স্মৃতি অনুভব করি। যারা এই নৃশংস বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ করেছিল, অনেক দেরিতে হলেও তাদের বিচার ও শাস্তিতে হৃদয়জুড়ে অনাবিল প্রশান্তি পেয়েছি।
পরদিন সন্ধ্যায় জানতে পারি ঢাকার ডিআইটি ভবনের টিভি স্টুডিও থেকে বিজয়ের সংবাদ সম্প্রচার হবে। দ্রুত টিভির সামনে বসে যাই। স্বাধীন দেশের টিভিতে প্রথম যাঁকে দেখি, তিনি ২ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হায়দার (যিনি চট্টগ্রাম থেকে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ঢাকায় এসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর হত্যার শিকার হন)। মেজর হায়দারের মাধ্যমে টেলিভিশনে দেশবাসী দেখেছিল আনুষ্ঠানিক বিজয়ের সংবাদ। মুক্তিযোদ্ধারা কাঁধে অস্ত্র ঝুলিয়ে সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন। ওই দিন ক্র্যাক প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধারা টিভিতে অনুষ্ঠান ঘোষণারও দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন ফতেহ আলী চৌধুরী, প্রয়াত মনিরুল মনু, হাবিবুল আলম, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু প্রমুখ। বিজয়ের আনন্দ ও বেদনায় সেই রাতে আর ঘুম আসেনি।
পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশ। অথচ স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও বেদনার সঙ্গে বলতে হচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটেনি, বরং প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। একদিকে জনসমষ্টির ৮০ ভাগ দরিদ্র মানুষ। অবশিষ্ট ২০ ভাগের মধ্যে ১০ ভাগ মধ্য ও নিম্নবিত্ত। ৮ ভাগ দোদুল্যমান। ২ ভাগ ধনিকশ্রেণি। যাদের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ও সম্পদ। এরাই আমাদের শাসকশ্রেণি। এদের নিয়ন্ত্রণাধীন দেশ। জনসমষ্টির ৮০ ভাগ আর ২০ ভাগ মানুষের শ্রেণিবৈষম্যের নিরসন না হলে প্রকৃত স্বাধীনতা অধরাই রয়ে যাবে। সমাজের এই শ্রেণিবৈষম্যের স্থায়ী সমাধানে সমাজের মৌলিক পরিবর্তন কেবল আবশ্যক নয়, অনিবার্যও বটে। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন জরুরি বিদ্যমান ব্যবস্থার স্থায়ী অবসান। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধ সমাজবদলের। সমষ্টিগত মানুষকে সমাজবদল কেবল স্বাধীনই করবে না, দেবে মুক্তিও।
নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত