দেশে এত ডিগ্রিধারী বেকার মানুষ, এত চাকরিপ্রত্যাশী, তবু শিক্ষক নেই। শিক্ষকসংকট সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে বলে বারবার সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। বিষয়টি বেশ শ্রুতিকটু।
স্কুলে সহকারী শিক্ষকের নিয়োগ দেওয়ার জন্য সেই কবে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। সহকারী শিক্ষকের আড়াই হাজার শূন্য পদে নিয়োগদান প্রক্রিয়ার ধীরগতির ফলে চাকরিপ্রত্যাশীরা ভীষণ হতাশ। তাঁরা অনেকেই মেধাবী হওয়ায় ইতিমধ্যে ভিন্ন ও অপেক্ষাকৃত জনপ্রিয় পেশায় চলে গেছেন।
এই পর্যায়ে বেশি অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানির বিষয়টি। মাধ্যমিকে পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য ২ হাজার ১৫৫ জনের চাকরি ঝুলে আছে। ভেরিফিকেশনে ধীরগতি ও রাজনৈতিক বিবেচনার নামে ছুতো খুঁজে বের করে হয়রানির মাত্রা চরম পর্যায়ে চলে গেছে বলে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগ সব ধরনের চাকরি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। এটা ঘুষ-দুর্নীতির প্রবণতাকে আরও বেশি উসকে দিয়েছে আমাদের সমাজে। কারণ, যাঁরা এই সেবায় নিয়োজিত, তাঁরা নিজেরা অনেক বেশি অর্থ খরচ করে চাকরি পেয়েছেন বলে নিজ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা অবৈধ কায়দায় সেই অর্থ অর্জন করতে তৎপরতা চালাতে সচেষ্ট হয়ে পড়েন। ফলে সামাজিকভাবে দুর্বল শ্রেণির পরিবারের প্রার্থীদের ওপর নিয়মের খড়্গ নেমে আসে। অথচ একই চাকরি বা প্রমোশনের ভেরিফিকেশনের বেলায় কোনো প্রার্থীর পৃষ্ঠপোষকতায় হোমরাচোমরা কেউ আছেন, সেটা আঁচ করতে পারলে তাঁরা নীরবে বিনা হয়রানিতে খুব দ্রুত তাঁদের কাজ করে দেন বলে জানা গেছে। তাই ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় মাৎস্যন্যায়ে রূপান্তরিত হয়ে পড়েছে।
তাই আধুনিক যুগে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি ও পক্ষপাতিত্বের কারণে এ ব্যবস্থা তুলে দেওয়া দরকার বলে অনেকে মনে করেন। কারণ, এই হয়রানি দিন দিন ঘুষ-দুর্নীতি, সামাজিক অস্থিরতা ও মানসিক সমস্যা সৃষ্টি ও তা বৃদ্ধি করে চলেছে। সরকার একটি সামাজিক শুমারির মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের পারিবারিক ডেটাবেইস তৈরি করে তা সরকারি ডেটাব্যাংকে রেখে দিলেই ঝামেলা চুকে যায়। তাহলে প্রতিবেশী দেশের চটপটে ইংরেজি জানা বাংলাভাষী বিদেশিরা আমাদের দেশে তাঁদের আত্মীয়দের মাধ্যমে এ দেশের ঠিকানা ব্যবহার করে আরেকটি উচ্চতর বাংলাদেশি ডিগ্রি নেওয়া বা সরকারি চাকরিতে ঢোকার সুযোগ পাবেন না। তাই শুধু আমাদের দেশে অবস্থানরত বিদেশিরা কীভাবে চাকরি করছেন, তাঁদের ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে কি না বা তাঁরা ভুয়া কি না, সেগুলোর অনুসন্ধান করা দরকার। আমাদের দেশে দশ লাখের অধিক বিদেশি বিনা ট্যাক্সে চাকরি করে অর্থ পাচার করছেন বলে সংবাদে জানা গেছে। তাঁদের এ দেশে চাকরি করা ও অবস্থানের বৈধতার ওপর পুলিশ ভেরিফিকেশন করা দরকার।
দেশের বহু উচ্চশিক্ষিত মেধাবীরা শত শত আবেদন করে চাকরি লাভ করতে না পেরে অবশেষে প্রাইমারি স্কুলে যোগদান করেন। কারণ, বড় পদের সরকারি চাকরিতে প্রতিযোগিতা খুব বেশি। তার ওপর ভাইভা পর্যন্ত গিয়ে নানা ছলাকলার সম্মুখীন হয়ে অনেকেই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ যোগ্যতার কাছে নতজানু হয়ে বিফল হয়ে পড়েন। সব প্রার্থীর শক্তিশালী রাজনৈতিক ক্ষমতাধর আত্মীয়, বন্ধু বা সুপারিশকারী নেই। বেসরকারি চাকরিপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও প্রকট।
কারণ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি সাধারণত নিজেদের আত্মীয় ও পরিচিতজনদের মধ্যে ভাগাভাগি করে পাওয়ার অলিখিত নিয়ম আমাদের দেশে বেশি প্রচলিত। কোনো প্রাইভেট ব্যাংক বা কোম্পানিতে বিশেষ যোগ্যতা ব্যতিরেকে মালিক বা পরিচালকমণ্ডলীর পরিজন ছাড়া চাকরি পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার। সেগুলোতে খালি হয় পদ। শূন্য পড়ে থাকে নিজেদের আপনজন যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পার্টটাইমার দিয়ে ‘কাজ চালানোর’ প্রবণতা আরও বেশি। আমাদের দেশে শত শত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থায়ী শিক্ষক-কর্মচারী নেই। এমনকি বেসরকারি উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভিসি-প্রোভিসি ও ট্রেজারারও নেই। অদৃশ্য কারণে দায়সারাভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সেগুলোয় রাত-দিন ক্লাস নেন, পরীক্ষা নেন। তাঁরা নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও পড়ানোর যথেষ্ট সময় বের করতে পারেন না।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষক নিয়োগে কার্পণ্য করা হয় নানা কারণে। এভাবেই চলে আসছে আমাদের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম। এভাবে নতুন নিয়োগ ও পদায়ন ছাড়াই চলছে তাঁদের কাজ।
অপরদিকে বেকারদের যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সেগুলোয় স্থায়ী নিয়োগের সুযোগ বা চাকরি পাচ্ছেন না। কেউ কেউ অর্থাভাবে বা সময় কাটানোর জন্য সেগুলোতে ঢুকে যাচ্ছেন। বেতন বেশি পেলে প্রাইভেট ব্যাংকের চাকুরেরা ব্যাংক বদল করতে দেরি করেন না। অপরদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরতরাও একই কাজ করে থাকেন। ভালো অফার পেলেই হলো। গণিত, ইংরেজি, আইসিটি বা কম্পিউটারের শিক্ষকেরা বেশি আয়ের সুযোগ পেলে এক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে ঘন ঘন চাকরি বদল করে থাকেন। বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানেই সাময়িক চাকরি লাভ করেন তাঁরা। তাই বেশি অর্থের হাতছানি পেলে কর্মরত প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে এক মিনিটও দেরি করেন না। এ যেন প্রাইভেট টিউশনি করার মতো অবস্থা।
যাঁরা চেষ্টা করেও ভিন্ন পেশার চাকরি জোটাতে পারেননি, তাঁরা নিরুপায় হয়ে সরকারি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়ার জন্য দিনক্ষণ গুনে বসে কালাতিপাত করছেন। অন্যদিকে সরকার বলছে শিক্ষকের অভাবে শিক্ষালয়ে পাঠদানে নিদারুণ সংকটের কথা।
পদ নেই তাই স্কুলগুলোয় প্রধান শিক্ষক পদে পদায়নের সংকট প্রকট। অপরদিকে বলা হচ্ছে, পদোন্নতিযোগ্য শিক্ষক নেই ২৬২টি স্কুলে। এই উভয়বিধ সংকটে নিপতিত হয়ে পদমর্যাদা ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষক।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, ঘুষ-দুর্নীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা প্রশাসকেরা অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সেসব বিষয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি; বরং অধিকাংশ জায়গায় তাঁরা সংযুক্ত হয়ে পড়েছেন ভৌত নির্মাণকাজে। তাঁদের আসল উদ্দেশ্য যেন নস্যাৎ হয়ে না যায়।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘দেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ হাজার ১৫০টি শিক্ষকের পদ শূন্য’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫. ১১.২০২১)। একশ্রেণির ভিসি অবৈধ পন্থায় নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার কোয়ালিটিকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের স্বেচ্ছাচারিতার তদন্ত শেষে অনেকের নামে এখন মামলা ঝুলে আছে। সেগুলোরও কোনো অগ্রগতির খবর শোনা যাচ্ছে না।
আমাদের দেশে ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯৫ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৫৮ জন এবং ছাত্রী ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৩৭ জন। শিক্ষকের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৯৩। তার মধ্যে ৪ হাজারের বেশি পদ শূন্য থাকলে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করে এত বিষয় পড়ানোর মানুষ কোথায়? সেদিন একটি বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় সেরা হয়ে ডিনস্ পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন অধ্যাপক জানালেন, তাঁর মতে উচ্চশিক্ষায় হাইয়ার এডুকেশন ক্লাইমেট অ্যাকশন পার্টনারশিপ (হেকেপ), ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুওরেন্স সেলের (আইকিউএসি) ফলাফল শূন্যের কোঠায়। সেসব প্রকল্প কিছু ল্যাপটপ, চেয়ার-টেবিল ক্রয় ছাড়া আমাদের গবেষণায় কাজের গুণগত মানোন্নয়নে আর কিছুই দিতে পারেনি। নামকরা গবেষকেরা সেসব প্রকল্পে দু-তিনবার আবেদন করেও অনুদান পাননি।
বেশির ভাগ প্রকল্প বরাদ্দ করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। সেসব প্রকল্পের গবেষণা ফলাফল থেকে কতটি মানসম্মত আর্টিকেল বা বই প্রকাশিত হয়েছে, তার খোঁজ কি কেউ নিয়েছে? আমাদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রে জবাবদিহির যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢাললেও বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং বাড়ানো যাবে না। তাই এসব দুরবস্থা নিরসনে প্রকৃত গবেষকদের মূল্যায়ন করতে হবে। ‘ফেয়ার ফ্যাকাল্টি নিয়োগ’ পদ্ধতি মেনে মেধাবী শিক্ষক ও গবেষক নিয়োগ দিতে হবে। তা না হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ধুঁকে ধুঁকে মরে যেতে যেতে একসময় অন্তঃসারশূন্যতা তৈরি হবে। যার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে অনুধাবন করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নিজেই। কারণ, শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় মেধাবীরা আসতে চায় না। এলেও থাকতে চায় না। ফলে আমরা হারাচ্ছি মেধা। শূন্য হচ্ছে পদ।
এভাবে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় ক্রমাগত আসা-যাওয়ার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষকের পদ খালি পড়ে থাকলে উপায় কী? ভালো শিক্ষক নেই তো ভালোভাবে পড়াবেন কে?
লেখক: ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়