পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন চুক্তিপূর্ব পরিস্থিতি! এমনটিই বলেছেন জাতীয় জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই যুগ পূর্তির আগে সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এই অভিমত জানান তাঁরা।
সম্প্রতি একটি সভায় প্রায় একই কথা বলেছেন জেএসএসের সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমাও। সে কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। অথচ এই চুক্তির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন সম্পর্কে সবার এতটাই নিশ্চিত ভরসা ছিল যে এ বিষয়ে কোনো গ্যারান্টার রাখার কথা কেউ ভাবেননি, যা এ ধরনের চুক্তি বাস্তবায়ন নিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জেএসএসের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই
চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় দুই দশকের সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এ বছর সেই চুক্তি ২৪ বছর পার করে ২৫ বছরে পদার্পণ করল।
নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রায় সিকি শতাব্দী অতিক্রম করে এসে এখন চুক্তির একপক্ষ, জেএসসের অভিমত—চুক্তিটি বিবদমান বিষয়গুলোর মীমাংসার জন্য যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়নি। ফলে এটি বাস্তবতার সঙ্গে বিসদৃশ একটি চুক্তিতে (Discordant Accord) পরিণত হয়েছে।
অবশ্য এই অভিমত বা মূল্যায়ন শুধু জেএসএসের নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তিসমূহেরও।
অন্যপক্ষ সরকারের দাবি, চুক্তিটি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে চুক্তির অধিকাংশ শর্তাবলি বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশিষ্টাংশও বাস্তবায়নাধীন আছে। চুক্তিবদ্ধ দুই পক্ষের এসব বক্তব্যের মধ্যেই কমবেশি সত্যাসত্য রয়েছে। আছে উন্নয়ন ও রাজনীতির বিষয়াদিও। সেসব নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে খোলা চোখে কিছু বিষয় দেখে নেওয়া যেতে পারে।
যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অবকাঠামোগত দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে ও হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নতিও চোখে পড়ার মতো। এসব উন্নয়নমূলক কাজ ঠিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সুফল, সে কথা বলা যায় না। বরং এগুলোকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ বলা শ্রেয়। তবে এ কথাও ঠিক যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে জুম্ম জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নের অঙ্গীকার রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপুল পরিমাণ জায়গা অধিগ্রহণ করে মেডিকেল কলেজ এবং আরও কিছু স্থাপনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো অবশ্যই ওই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে, অঞ্চলটির আয়তন দেশের মোট আয়তনের এক-দশমাংশ হলেও সেখানে বসবাসযোগ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপযোগী জায়গা খুবই কম। তাই বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এত জায়গা ব্যবহার করা হলে সাধারণ মানুষের সমস্যা বাড়বে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ নিরসন চুক্তির একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি বিরোধেরও মীমাংসা হয়নি। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এখন কার্যত অকার্যকর।
১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত সেনাবাহিনীর সঙ্গে শান্তি বাহিনীর যুদ্ধ চলাকালে প্রায় ৮৩ হাজার পাহাড়ি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছিল। চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, যা এখনো হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও মৌলিক অধিকারসমূহের প্রতিষ্ঠা চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। কিন্তু জুম্মদের অভিযোগ, এখনো তা হয়নি।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা, সংঘর্ষ-সংঘাত, হত্যাকাণ্ড, রাহাজানি অব্যাহতভাবে ঘটে চলেছে। যেখানে জেএসএস ছিল একমাত্র রাজনৈতিক দল, সেখানে এখন ইউপিডিএফ, তাদের আরেকটি ভগ্নাংশ, জেএসএস (এমএন লারমা) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অব বোরোল্যান্ড নামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রসার ঘটছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া সেখানে রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ। এসব দল ও গ্রুপের মধ্য আন্তর্দলীয় ও অন্তর্দলীয় কোন্দলও বিদ্যমান।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ, জেএসএস এবং জেএসএস (এমএন লারমা) মনে করে, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে সেখানকার পরিস্থিতি এমনটা হতো না। আর উল্লিখিত শক্তিগুলোর মধ্যে অন্যরা মনে করে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আর কতকাল এ রকম একটি বিষফোড়া হয়ে থাকবে?