আজ থেকে ৩৮ বছর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪, সকালে মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিনের স্ত্রী বিলকিস ছয়টি মাসুম সন্তানকে বুকে জড়িয়ে প্রিয় স্বামীকে অনিচ্ছায় বিদায় দিয়েছিলেন। সব উদ্বেগ লুকিয়ে হয়তো হাসিমুখেই তা করেছিলেন। তবে তিনি কি আগে থেকেই কিছু আঁচ করতে পেরেছিলেন?
সেদিন সকাল থেকেই আকাশে কালো মেঘের বিষণ্ন আনাগোনা বিদায়ী বর্ষা ঋতু সরব উপস্থিতি জানিয়ে দিচ্ছে। স্বৈরাচারের প্রতিবাদে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দেশব্যাপী হরতালের ডাক দিয়েছে। হরতাল ঠেকানোর জন্য শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ব্যাংক, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব বন্ধ, দু-একটি রিকশা ছাড়া রাজপথে তেমন কোনো বাহন চোখে পড়ছে না। রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটি নেড়ি কুকুর। পুরো দেশটি অচল। থেকে থেকেই বিকট শব্দ করে পুলিশের গাড়িগুলো টহল দিচ্ছে।
প্রধান সড়কের মোড়ে অস্ত্র হাতে একদল সন্দেহভাজন লোক পুলিশের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছে। তাদের চেহারায় কুটিলতা। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা এক পতিত জেনারেলের উচ্ছিষ্টভোগী ভাড়াটে খুনি এরা। অজানা আশঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। জনজীবন স্থবির, স্তব্ধ হয়ে গেছে। চারদিকে থমথমে ভাব। এ যেন ঝড়ের আগে নিস্তব্ধতা। ভয়াবহ একটা কিছু ঘটে যেতে পারে।
ঠিক এ সময়ই শহরের অন্য প্রান্তে একজন সৌম্যদর্শন সাহসী নেতাকে ঘিরে জড়ো হয়েছে বেশ কিছু মুক্তিপাগল নারী-পুরুষ। চুয়ান্ন বছর বয়সের এই জনপ্রিয় নেতার নাম মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন। মেধাবী এবং তুখোড় ছাত্রনেতা। পাকিস্তানের শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসার জন্য গাজীপুরে গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। গাজীপুরের কালীগঞ্জে নিজ এলাকায় জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন দৃঢ়চেতা এই মানুষটি। তিনি ছিলেন বরাবরই অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, একজন নির্মোহ এবং বিশ্বস্ত জননেতা, যার ওপর আস্থা রাখা যায়। প্রজ্ঞা, বোধ আর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। আর তাই তরুণ বয়সেই রাজনীতিতে তিনি ছিলেন উপকথার বরেণ্য চরিত্র, জীবন্ত মিথ।
বেশ কয়েকজন সহকর্মী, সুহৃদ তাঁকে সতর্ক করেছিলেন এবং নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে আজ দুর্বৃত্তদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছেন তিনি—মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন। কারণ তিনি ছিলেন স্বৈরাচারের মূর্তিমান আতঙ্ক। শহীদ ময়েজউদ্দিন ছিলেন একজন সত্যিকারের নেতা। তিনি নিজের প্রাণপ্রিয় কর্মীদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন না। এই অকুতোভয় নেতা ১৯৭১-এ নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, স্বাধীন করেছিলেন দেশ।
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কোনো আপস নেই, স্বতঃস্ফূর্ত জনতার মিছিল নিয়ে এগিয়ে গেলেন তিনি। রাষ্ট্রীয় পেটোয়া বাহিনী ওত পেতে ছিল। নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এই ক্ষণজন্মা নেতাকে, কালীগঞ্জের পবিত্র মাটি রঞ্জিত হয় তাঁর রক্তে।
সেলিম, দেলোয়ার, জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহা, মোজাম্মেল, আইয়ুব, তিতাস, রমিজ, বসুনিয়া, চুন্নু, নূর হোসেন, ডাক্তার মিলন—এমন নামের তালিকা অনেক লম্বা। এই তালিকায় যুক্ত আরেকটি বিষণ্ন নাম মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন। আজকের এই দিনে আমরা এমন একজন দেশপ্রেমিক নেতাকে হারিয়েছি। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার লাল সূর্যের সঙ্গে মিশে আছে এমন শহীদের পবিত্র রক্ত। তাই গুণী অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্যের ভাষায়,
‘জীবনের যাত্রাপথে অগণিত যাত্রী চলে
কে বা কারে মনে রাখে?
স্মৃতির ফলকে ক্ষণেক দাঁড়ায়ে
যাঁরা পদচিহ্ন যায় রেখে
তাঁরা মনে থাকে’
লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক