বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে ১৭ জুন প্রকাশিত একটি নিবন্ধ থেকে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রতি ছয়জন প্রবীণের মধ্যে অন্তত একজন নির্যাতনের শিকার হন। আবার ল্যানসেট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ জরিপে দেখা যায়, ৬০ বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে মানসিক নির্যাতনের শিকার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থনৈতিক নিষ্পেষণের শিকার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, অবহেলার শিকার ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২ দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশে এ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা বা জরিপ পাওয়া না গেলেও, অনুমান থেকে বলা যায়, বাংলাদেশেও প্রবীণদের ওপর নিপীড়নের মাত্রা কম নয়, বরং বেশিই হতে পারে।
বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতায় পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা বা ভরণপোষণ না দেওয়াকে অত্যন্ত গর্হিত চোখে দেখা হয়। কিন্তু ক্রমবর্ধমান যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার তৈরি হওয়ার প্রবণতা এবং আধুনিক জীবনযাত্রার গোলকধাঁধায় অবহেলা ও অযত্নের শিকার হচ্ছেন প্রবীণ পিতা-মাতা। পিতা-মাতার অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে রাষ্ট্র প্রণয়ন করেছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩। বৃদ্ধ পিতা-মাতার অধিকার এবং সার্বিক মঙ্গল নিশ্চিতকল্পে এই আইনটি জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের ৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন আদালত সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা-মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত কোন অভিযোগ আমলে গ্রহণ করিবে না।’ ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় কোনো বৃদ্ধ পিতা-মাতা, যার সন্তানের অবহেলার দরুন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, তাঁর পক্ষে নিজে উপস্থিত হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়া দুরূহ ও জটিল। আবার এ আইনে মাঠ প্রশাসনের দ্বারা কোনো রকম প্রতিকার পাওয়ারও সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে কারও মাধ্যমে অভিযোগ পেলেও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আইনানুগভাবে কোনো উদ্যোগ ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেন না।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কোনো সমস্যায় পড়লে জরুরি প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হয়। এ ছাড়া মফস্বলের সাধারণ মানুষসহ বেশির ভাগ নাগরিক তাদের সমস্যা পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমেই সমাধানে বেশি আগ্রহী। ফলে ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে পুলিশ প্রশাসনের মধ্যেও জনমানুষের সমস্যা সমাধানে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একদিকে যেমন দায়বদ্ধতা কাজ করে, অন্যদিকে নাগরিকের সেবার বিষয়টিও তাদের দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
পুলিশ প্রশাসনের পরে জনগণের নানা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পর্যায় হলো উপজেলা প্রশাসন। মানে ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা’। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয়ে প্রতিদিন জমা হওয়া শত রকমের শত শত আবেদন জনগণের আস্থারই প্রতিফলন। এ প্রশাসন ইতিমধ্যে বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুসমূহ, যেমন দ্রব্যমূল্য মনিটরিং, সার ও বীজ কালোবাজারে বিক্রি রোধ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পাবলিক পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধসহ ইত্যাদি বিষয়ে তদারকির দায়িত্ব পালন করে থাকে। এ ছাড়া স্থানীয় নানা বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন, প্রতিবন্ধী-বিধবা-বয়স্ক ভাতা প্রদান তদারকিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে থাকে।
নিজের কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অনেক বৃদ্ধ পিতা-মাতা নিজেদের অসহায়ত্ব, সন্তান দ্বারা নিপীড়ন ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে উপস্থিত হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। কিন্তু পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর অধীনে স্থানীয় প্রশাসনের কিছু করার থাকে না। এ ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উভয় পক্ষকে নোটিশ প্রদান, পিতা-মাতার ভরণপোষণের বিষয়ে শুনানি গ্রহণ, আদেশ প্রদান এবং সর্বোপরি আদেশ অমান্যে তাৎক্ষণিক দণ্ড প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য স্বল্প সময়ে অধিকতর ফলপ্রসূ উপায়ে অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। উল্লেখ্য, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর ৫(১) ধারায় দণ্ড হিসেবে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাস বিনাশ্রমে কারাদণ্ডের কথা আছে। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা নির্ধারিত যেকোনো পরিমাণ অর্থদণ্ড আরোপ করতে পারেন।
এ ছাড়া গ্রাম আদালতের অধীনে আইনটি অন্তর্ভুক্ত করা হলে প্রচলিত আদালতের আনুষ্ঠানিকতা, সময় ও ব্যয়ভার সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি অভিযুক্ত সন্তানদের সামাজিক পরিসরে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হবে।
এ ক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের অধীনে একটি বিধিমালা প্রণয়ন এবং আইনটিকে পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন এবং গ্রাম আদালত দ্বারা প্রয়োগযোগ্য করে যুগোপযোগী করার পদক্ষেপ নেওয়া হলে, বৃদ্ধ পিতা-মাতার অধিকার রক্ষায় মাঠ প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিরা আরও বলিষ্ঠ এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হিউবার্ট এইচ হামফ্রে বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের নৈতিক পরীক্ষা নির্ধারিত হয় তারা জীবনের গোধূলিলগ্নে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে, তার ওপর।’ বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে জীবনসায়াহ্নে এসে একটু ভাত, একটু মোটা কাপড়ের জন্য যাতে জটিল আইনি মারপ্যাঁচে আটকে যেতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই। স্থানীয় প্রশাসন এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।