দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। হাল ফ্যাশনের গাড়ি-বাড়ি বেড়েছে। বিদেশিদের অনুকরণে নানা মেগা প্রজেক্টের কাজ চলছে। শুধু গাড়িই নয়, বিদেশি ট্রেনের বগি, বিলাসদ্রব্য, খাদ্যসামগ্রী, পোশাক, মাদক, কুকুর, পাখি সবকিছুই এখন হাতের কাছে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। বিদেশি কর্মীদের আনাগোনা বেড়েছে। তাই বিদেশি দামি হোটেল-রেস্টুরেন্টের সংখ্যাও অগণিত। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, সারা দেশে এসব কিছুর অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে, ‘আমরা বড়লোক হয়ে গেছি’। একজন কলামিস্ট এত কিছু লক্ষ করে ইতিমধ্যে প্রশ্ন ছুড়েছেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, বড়লোক বাংলাদেশে আমার অবস্থান কোথায়?’ (জাগোনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কম, ১৩. ১১.২০২১)।
তিনি হয়তো বলতে চেয়েছেন, আমাদের ষোলো কোটি মানুষের সবার দৈনিক আয়কে গড় করলে সাড়ে ৩ কোটি নিম্ন আয়ের মানুষ, ৪০ লাখ শিক্ষিত বেকার, ৬০ লাখ অর্ধশিক্ষিত বেকার, পরিসংখ্যানবিহীন অগণিত নদীভাঙা মানুষ, টোকাই, ভাসমান মানুষ, ভিক্ষুক, পতিতা, ভবঘুরে, রাতের খাবার না খেয়ে রেল বা বাসস্টান্ডে ঘুমানো ভুখা মানুষেরা তাঁর মনের মধ্যে অবস্থান করছেন। তিনি তাদের তাঁর নিজের হৃদয়ে ঠাঁই দিয়ে নিজের অবস্থানের কথা জানতে চেয়েছেন নির্দ্বিধায়। কারণ, দেশটা তো সবার। কণ্ঠশিল্পী রথীন্দ্রনাথের জনপ্রিয় গানের কথায়—‘আমারই দেশ সব মানুষের...ধনীদের, গরিবের, কামারের, মজুরের।’
গত বছর ময়লার ট্রাকের চাপায় কলেজছাত্রের পিষ্ট হয়ে অকালে মৃত্যুবরণের ঘটনা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। তখন জানা গেল ময়লা পরিষ্কারের জন্য নিয়োজিত ব্যক্তিরা মূল ঠিকাদারদের সাব-অতি সাব ঠিকাদারি ভাগ-বাঁটোয়ারার মাধ্যমে বাগিয়ে নেয়। মূল ড্রাইভার রাজা সেজে ঘরে শুয়ে আয়েশ করেন। তাঁর পরিবর্তে ময়লা সরানোর ট্রাক চালানো হয় হেলপার দিয়ে। যাঁদের প্রায় সবাই লাইসেন্সবিহীন। এসব অভিজ্ঞতাহীন, সনদবিহীন চালকেরা আজ মৃত্যুদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পথচারীদের প্রাণ হরণে নেমে পড়েছেন। আনাড়ি ও অবৈধ চালকের হাতে চাবি দিয়ে ভারী ময়লার ট্রাক চালানোর কাজ করানোর জন্য প্রায়ই করুণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলেছে।
নটর ডেমের নাঈমের রক্ত রাজপথে না শুকাতেই একরামুন্নেছা স্কুল ও কলেজের দুর্জয়কে পিষে দিয়েছে ময়লাবাহী ট্রাক। চট্টগ্রামে ভাড়া নিয়ে বচসার জেরে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে পেছনের চাকায় পিষ্ট করে মারাত্মক জখম করে দিয়েছে এক স্কুলশিক্ষককে তিন পাষণ্ড। যারা এই অপরাধ করেছে তারা তিনজন বাসের কন্ডাক্টর, হেলপার ও ড্রাইভার। তারা তিনজনই মাদকাসক্ত বলে টিভিতে জানা গেছে এক দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের মুখে। অথচ মাদকসেবী এরাই নাকি পরিবহন-সেবক!
রামপুরায় এক স্কুলছাত্রকে পিষ্ট করে মেরে ফেলেছিল আরেক বাস। ছাত্র-জনতা বাসটি আগুনে পুড়ে দিয়েছিল। রাস্তা অবরোধ করে রেখে যানজট তৈরি করেছিল। এরপর বর্ধিত বাসভাড়া বাতিলের দাবিতে ছাত্রছাত্রীদের প্রচণ্ড আন্দোলনের মুখে শুধু ঢাকা শহরে হাফ ভাড়ায় শিক্ষার্থীদের চলাচলের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাস মালিক সমিতির সেক্রেটারি। কিন্তু সারা দেশের কোটি শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকে কেন বঞ্চিত হবে? তিনি বলেছিলেন, ৮০ ভাগ বাসমালিক গরিব। বাসভাড়া কমালে তাঁরা পরিবার নিয়ে না খেয়ে মারা যাবে। তাই যদি হয়, তবে মেয়াদোত্তীর্ণ বাস চালিয়ে কেন পরিবেশ দূষণ করেন? মাদকসেবী চালক দিয়ে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ হত্যা করেন? বাস-ট্রাক বাদ দিয়ে রিকশা চালালেই তো দুর্ঘটনা হবে না। কোটি কোটি টাকায় কেনা নতুন নতুন মডেলের বাসমালিকেরা গরিব হলে দেশের বিত্তশালী কারা? বাসমালিকেরা কি বস্তিতে থাকেন? তাঁদের বসতবাড়ি ও ব্যক্তিগত গাড়ির মডেল কেমন, তা সবাই জানেন। যদি বাসমালিকেরা গরিব হন তাহলে দেশের ভিক্ষুকদের তো নিজস্ব মার্সিডিজ বা হেলিকপ্টার থাকার কথা। বাসমালিকেরা গরিব হলে ধনী কারা? দেশের ভিক্ষুকেরা কি সিডান কার বা মার্সিডিজে চড়ে?
এসব ঘটনার অনেক সময় পেরিয়েছে। এখন হাফ ভাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে কতজন না খেয়ে মারা গেছে অথবা ভবিষ্যতেও এরূপ কিছু ঘটবে কি না, তা কিন্তু দেখার বিষয়।
গাড়িচালকদের ১, ২, ৩ নম্বরধারী লাইসেন্স ছাড়াও প্রিকোয়ালিফাইড লাইসেন্স দেওয়ার বিধান রয়েছে। অনেকে নতুন গাড়ি কিনে লাইসেন্স পাওয়ার আগেই অন টেস্ট লিখে জনবহুল রাস্তায় নেমে পড়েন। আমাদের দেশে বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ নিজেরা গাড়ি চালায় না। তারা ঠিকাদারদের মাধ্যমে দৈনিক বা রুটভিত্তিতে দায়িত্ব দিয়ে কাজ করান। বিআরটিসি গাড়ি রাস্তায় বেশি বেপরোয়াভাবে চলাচল করে। যারা এই গাড়ির যাত্রী তারা বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করে থাকেন। রাস্তায় চলাচলের সময় সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয় এই গাড়ি। তাই সরকার এই গণপরিবহন থেকে বিপুল পরিমাণ মেইনটেন্যান্স খরচ দিয়ে লাভের মুখ দেখতে পায় না। তবু এই গাড়ি রাস্তায় চলাচল করে এবং কিছুদিন পরপরই নতুন গাড়ি অকেজো হয়ে ডিপোতে ডাম্পিংয়ে চলে যায়। সাজঘর থেকে ফেরে না সিংহভাগ গাড়ি। তখন পুনরায় নতুন দামি-গাড়ি বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ মূল্য দিয়ে কেনা হয়। সরকারের লোকসানের বোঝা হয়ে দাঁড়ায় প্রতিষ্ঠানটি। যেমনটি ঘটে চলেছে ডেমু ট্রেনের ক্ষেত্রে। এ জন্য বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। আরও যে বিষয়টি বেশি উদ্বেগজনক তা হলো, একজনের ট্রেড লাইসেন্স বেনামিতে ভাড়ায় খাটানো।
স্থায়ীভাবে চাকরিপ্রাপ্ত বা তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের অনৈতিকভাবে ঠিকাদারি লাইসেন্স ভাড়া দেওয়া বা লিজ দেওয়া বন্ধ হলে রাস্তায় আনাড়ি চালকদের মাধ্যমে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধ ও ভুয়া সনদ প্রাপ্তির কারবার বন্ধ করা গেলে এবং সব চালকের ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা বহুলাংশে হ্রাস পাবে। জাপানের মতো হাইওয়ে পুলিশের হাতে স্বয়ংক্রিয় মাদক ডিটেক্টর মেশিন সরবরাহ করতে হবে এবং সৎ অফিসারদের মাধ্যমে হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট বা বিশেষ স্থানগুলোতে হঠাৎ ডোপ টেস্টের ভ্রাম্যমাণ আয়োজন করে সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামানো যেতে পারে।
কারণ অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশ এখন মাদকের বড় ভোক্তা। এর সিংহভাগ ভোক্তা নাকি দূরপাল্লার গাড়ির চালক। যদি তা হয়ে থাকে তাদের চিহ্নিত করে সংশোধন করতে না পারলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করে অবসরে পাঠাতে হবে। ঠিকাদারি সনদ যদি ভাড়ায় খাটে তাহলে বেকার যুবকদের বিভিন্ন ডিগ্রির সনদ ভাড়া দিতে দোষ কোথায়? ঘুষ-দুর্নীতি, জালিয়াতি, ভোট চুরি-ডাকাতি, পেশিশক্তিকে লাই দেওয়া ইত্যাদি অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিয়ে দিলে তো আর কোনো কিছুকেই অবৈধ বলে দোষারোপ করার সুযোগ থাকবে না! এসবের জন্য কোনো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানেরও প্রয়োজন থাকবে না।
বিশেষ শ্রেণির চিহ্নিত লোকদের বিনা ভাড়ায় গরিব বাসমালিকেরা কোন স্বার্থে চলাচলের সুযোগ দেন, তা মোটেও বোধগম্য নয়! প্রবাদে কি একেই বলে—তেলা মাথায় তেল দেওয়া বা মাসতুতো ভাই? আমরা ৮০ ভাগ জনতা গরিব বাসমালিক হতে চাইলে তখন বিষয়টি কেমন হবে? তাহলে গরিবের আত্মমর্যাদা স্বীকৃতি পেয়ে একটি কল্যাণকর সমাজ প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।