হোম > ছাপা সংস্করণ

‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়’

মযহারুল ইসলাম বাবলা

শিরোনামের কথাগুলোর প্রকাশকাল নিঃসন্দেহে ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ভারতবর্ষ যখন মোগল সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ রাজতান্ত্রিক ঔপনিবেশিকের অধীনে ছিল। রাজতান্ত্রিক শাসনামলের কারণেই রাজা, রাজ্য, প্রজা শব্দের প্রাসঙ্গিকতা, প্রচলন ও প্রকাশ পেয়েছিল। 

গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থায় রাজা-প্রজার ভিত্তি নেই। এবং অমন উক্তিও অপ্রাসঙ্গিক। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকেন। একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলই সরকার গঠন করে। পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনে সরকার বদল হয়। আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। এ ক্ষেত্রে প্রজা শব্দটি সম্পূর্ণরূপে অচল। অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিযুক্ত সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। তাই রাজার অস্তিত্বেরও অবকাশ নেই। সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকার গঠন ও পরিবর্তনের এখতিয়ার সম্পূর্ণরূপে জনগণের। রাষ্ট্রের ম্যানেজারির দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকার জনগণ সমর্থিত ও নির্বাচিত বিধায় রাষ্ট্র ক্ষমতাপ্রাপ্তির কথাটিও সাংবিধানিক নয়। কাগুজে হলেও সংবিধান জনগণকেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান করেছে। 

অথচ আমাদের দেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারসমূহ সাবেকি আমলের বৃত্ত অতিক্রম করতে পারেনি। নির্বাচিত ও অনির্বাচিত উভয় সরকারের শাসনামলে জনগণমাত্রই প্রজা এবং সরকারমাত্রই শোষক-রাজা। রাষ্ট্র-সরকার এবং আমাদের সামগ্রিক জীবনে গণতন্ত্র দৃশ্যমান রয়েছে তেমন ধারণা করা যায় না। রয়েছে তা কেবলই কাগজে। বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনোই মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। একমাত্র ভোটাধিকার প্রয়োগের তামাশার গণতান্ত্রিক অধিকার জনগণ কখনো প্রয়োগ করতে পারে, কখনো পারে না। এ ছাড়া আমাদের সমাজজীবনের অন্য কোনো ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার প্রতিফলন আমাদের দেখার সৌভাগ্য হয় না। সে কারণে শিরোনামের কথাগুলোর তাৎপর্য, গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতেও আমাদের দেশে প্রাসঙ্গিক বলা যায়।

সামগ্রিক অর্থে দুবারের স্বাধীনতায় দেশের শাসক বদল হয়েছে, ক্ষমতা হাত বদলে চলে গেছে শাসকশ্রেণির করতলে। জনগণ ক্ষমতাবান হতে পারেনি। সে কারণে ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতি স্বাধীন বাংলাদেশে অপরিবর্তিত রয়েছে। অবসান হয়নি রাজতন্ত্রের, মোল্লাতন্ত্রের ও সামরিকতন্ত্রের। নামেই কেবল নির্বাচিত। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন সরকারগুলোর সামগ্রিক আচরণ-ভূমিকা সম্পূর্ণরূপে স্বৈরতান্ত্রিক এবং অনিবার্যরূপে ফ্যাসিবাদী। 

ব্রিটিশ রাজতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান লড়াই-সংগ্রামে প্রতিপক্ষ ব্রিটিশদের পরাস্ত ও পরাজিত করে অর্জিত হয়নি। সে কারণে দাতার বেশে তারা দয়া-দক্ষিণার স্বাধীনতা (!) দিয়ে কেটে পড়েছিল। খণ্ডিত করে গেছে ভারতবর্ষকে। পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগে উচ্ছেদ-বিচ্ছেদের মর্মান্তিক রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল, যার পেছনে ব্রিটিশদের কারসাজি-ইচ্ছাপূরণ নিশ্চয়ই ছিল। অন্যদিকে ঘৃণিত ঘটনায় ক্ষমতালিপ্সু দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস-মুসলিম লীগেরও দায় এড়ানোর উপায় নেই। ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টে ব্রিটিশরা আর শত্রু ছিল না। দাতা-মিত্র হয়ে গিয়েছিল। পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। অন্য অর্থে হিন্দু-মুসলমান। একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতালিপ্সার কারণেই ঘটেছিল অনভিপ্রেত অঘটনসমূহ, যার দায় অভিযুক্ত দুই দলের রাজনীতিকেরা এড়াতে পারেন না। রাজনীতিকদের ক্ষমতালিপ্সার মাশুল দিতে হয়েছিল নিরপরাধ দুই সম্প্রদায়ের অসহায় মানুষকে।

ধর্মীয় বিভাজনে সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রটি যেমন ছিল কৃত্রিম, তেমনি অবাস্তবিক। জন্ম থেকে রাষ্ট্রটি সামরিক আমলাতন্ত্রকবলিত হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা অদ্যাবধি সেখানে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। দেশটির প্রথম সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও বাঙালি নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে চালিয়েছিল জাতি বিনাশে গণহত্যা। পরিণতিতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাভূত করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। 

কিন্তু যে স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে দেশের জনগণ, সেই স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা আজ অবধি অধরাই রয়ে গেছে। অবস্থাদৃষ্টে কেবল ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে। শাসক-সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তাই বর্তমান সময়ে ব্রিটিশ, পাকিস্তানি শাসনামলের ধারাবাহিকতা বললে অত্যুক্তি হবে না। পৃথক তিন রাষ্ট্রের শাসনামলের তুলনা-বিচার করলে অভিন্নই মনে হয়। আমরা স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছি, অবাঙালি শাসন-শোষণের কবল থেকে মুক্ত হয়েছি সত্য, পাশাপাশি স্বজাতি শাসকশ্রেণির দ্বারা ক্রমাগত শোষিত হচ্ছি, এটাও তো মিথ্যে নয়। 

ভোটাধিকার নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু গণতান্ত্রিকতার একমাত্র সনদ নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে সংস্কৃতি। অতীতের ব্রিটিশ, পাকিস্তানি এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার বিপরীতে অতীত আমলের শাসক-সংস্কৃতিই ধারাবাহিকভাবে শাসকেরা ধারণ করে এসেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রের তিন মূল স্তম্ভের ঘোষণা দিয়েছিলেন—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। স্বাধীনতার পর সংবিধানে ওই তিন স্তম্ভের অগ্রে যুক্ত করা হয় জাতীয়তাবাদ। অথচ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালেই জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত মীমাংসা কিন্তু সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমরা জানি কেবল জাতীয়তাবাদ ছাড়া অপর তিন মূল স্তম্ভের কোনোটি আর অক্ষুণ্ন রাখা হয়নি। একে একে বিদায় দেওয়া হয়েছে। 

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা থেকে ছিটকে পড়ার প্রবণতা এযাবৎকালের সব সরকারের মধ্যেই লক্ষ করা গেছে। প্রতিটি সরকারই নিজেদের জাতীয়তাবাদী দাবি করে এসেছে। তাই জাতীয়তাবাদের সীমা অতিক্রম করে সব মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠার বিপরীতে নিজেদের শ্রেণির সীমায় তারা আটকে রয়েছে। তাই অনায়াসে বলা যায়, রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্র নির্মিত হয়েছে, ভূখণ্ডের পরিসর বদলেছে, শাসক বদল হয়েছে, কিন্তু শাসকের চরিত্র বদলেছে এমন দাবি নিশ্চয়ই করা যাবে না। ঔপনিবেশিক আইন স্বাধীন দেশ থেকে বিদায় নেয়নি। আরও শক্তপোক্ত নিবর্তনমূলক আইন জনগণের ওপর চাপানো হয়েছে এবং ক্রমাগত হচ্ছে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা থেকে শুরু করে মানুষের সব গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। দেশে অবাধ গণতান্ত্রিকতা প্রবহমান আছে, তেমনটি বলার কোনো সুযোগ নেই। 

একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রের ও সরকারের স্বভাব-চরিত্রের বদল ঘটবে। দেশ গণতান্ত্রিক জোয়ারে ভাসবে। মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ সুরক্ষিত হবে। বাস্তবে তেমনটি ঘটল না। সংবিধানে রাষ্ট্রের মালিকানা রাষ্ট্রের জনগণ। বাস্তবতা ঠিক বিপরীত। জনগণই রাষ্ট্রের অধীন। রাষ্ট্র ছড়ি হাতে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মালিক জনগণের ওপরই তার কর্তৃত্ব ফলাচ্ছে। এই রাষ্ট্র অতীতেরই অনিবার্য ধারাবাহিক। এই রাষ্ট্র যেমন কর্তৃত্ববাদী আমলাতান্ত্রিক, তেমনি গণবিরোধী। এ দেশের সমষ্টিগত মানুষ ব্যক্তিগত পার্থিব সুবিধার লোভে দেশ স্বাধীন করেনি। সমষ্টিগত মুক্তিই ছিল তাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাজুড়ে। 

বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে অনেকেই হাপিত্যেশ করেন। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানে একক ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে সরকারপ্রধানকে। রাষ্ট্র ও দেশের সংবিধান যদি গণতান্ত্রিক না হয়, তাহলে সমাজকে গণতান্ত্রিক করে তোলা সম্ভব কীভাবে? ব্যক্তি ও পরিবার সমাজেরই অধীন, যেমন সমাজ রাষ্ট্রের অধীন। তাহলে সমাজে, পরিবারে ও ব্যক্তিতে গণতান্ত্রিকতা আসবে কোন উপায়ে? 

আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ পূর্ণ গণতান্ত্রিক নয়। অগণতান্ত্রিকতার সংস্কৃতি সর্বত্র বিরাজিত। স্বীকার করছি আমাদের সামগ্রিক সমস্যা রাজনৈতিক। তাই রাজনৈতিকভাবেই সমাধান খুঁজতে হবে। নির্বাচনে সমাধান আসবে না। নির্বাচনে কেবল শাসক বদল হবে। ব্যবস্থার বদল হবে না। ব্যবস্থার বদলেই সমষ্টিগত মানুষের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা যেমন পূরণ হবে, তেমনি বাস্তবায়িত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস