হোম > ছাপা সংস্করণ

পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

আমাদের এখানে তো যৌথ পরিবার ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও টিকে আছে। পশ্চিম বাংলায় যৌথ পরিবার বহু আগেই ভেঙে গেছে। সেখানে পরিবারমাত্রই ব্যক্তি ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরা। এর বাইরে ভাইবোনেরা তো পরের কথা, বাবা-মা পর্যন্ত পরিবারভুক্ত নয়। বিয়ের পর সন্তানেরা পিতা-মাতার দায়দায়িত্ব উপেক্ষা করে একত্রে বসবাস করে না। স্ত্রীর তাগিদে বা চাপে বাধ্য হয় তাৎক্ষণিক পৃথক হতে। ব্যতিক্রম থাকলেও সেটা অতি নগণ্য। আমাদের এখানেও তার প্রভাব ক্রমান্বয়ে পড়ছে বটে, তবে অত ব্যাপক আকারে এখনো বিস্তার লাভ করেনি। কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় একই দৃশ্য। বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানহীন একাকিত্বে প্রবল প্রতিকূলতায় জীবনসায়হ্নের সময়গুলো পার করছেন।

করোনার আগে কজন পরিচিতের বাসায় গিয়ে দেখেছি, প্রৌঢ়ত্বের শেষ সীমায় থাকা স্বামী-স্ত্রীতে বসবাস করছেন। দুজনে মিলেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘরকন্না করছেন। অসুস্থ স্ত্রী কিংবা স্বামীর সেবা-শুশ্রূষার পাশাপাশি ঘরকন্নার কাজেও ব্যস্ত দেখেছি। ছেলের বিয়ের ছয় মাস-এক বছরের মাথায় বউমার প্ররোচনায়, জেদ ও কৌশলে ছেলেকে নিয়ে দূরে ভাড়া বাসায় কিংবা কেনা ফ্ল্যাটে বাবা-মাকে একলা ফেলে চলে যাওয়ার অসংখ্য ঘটনা দেখেছি। বৃদ্ধ বয়সে রেশন তোলা, বাজার করা, বিদ্যুতের বিল, গ্যাসের সিলিন্ডার আনা, সেবা খাতের বিল পরিশোধসহ সামগ্রিক কর্মযজ্ঞ অসহায় পিতাকেই করতে হয়। পিতা অসুস্থ থাকলে মাকেই বাধ্য হয়ে সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়। তাঁদের সেই কষ্টকর অমানবিক জীবনযাপন দেখার সুযোগ হয়েছে কলকাতায়।

নদীয়ার ফুলিয়াতে গিয়েও দেখেছি আমাদের কথাসাহিত্যিক হরিপদ দত্তের পরিবারের অভিন্ন দশা। রোগে ভুগে বার্ধক্যে হরিপদ দাদা নিরুপায় হয়ে দেশ ছেড়ে পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন কয়েক বছর আগে। বাংলাদেশে সাহিত্যিক হিসেবে তিনি খ্যাতিমান। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক হরিপদ দত্ত এখন গ্রাম-মফস্বল ফুলিয়ায় সামাজিক জীবনবিচ্ছিন্ন একজন অতি সাধারণ মানুষ মাত্র। সেখানে তাঁর কোনো সামাজিক জীবন নেই। তাঁকে পরিবারের সমস্ত কাজকর্মে ব্যস্ত জীবন কাটাতে হয়। সেখানকার পত্রপত্রিকায় লেখালেখি তো পরের কথা, তিনি যে সাহিত্যিক, এই পরিচয়টুকু পর্যন্ত কেউ জানে না। বাংলাদেশ প্রত্যাগতরা পশ্চিম বাংলার সাহিত্যসমাজে পুরোপুরি ব্রাত্য। হরিপদ দাদার একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে বহরমপুরে থাকেন। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করেন। একমাত্র ছেলে, সেও পিএইচডি সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। কয়েক বছর আগে কৃষ্ণনগর থেকে পারিবারিক উদ্যোগে ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন। বউমাও সরকারি স্কুলের শিক্ষক। ছেলের বিয়ের আগে ধারদেনা করে একতলা বাড়িতে দোতলা তুলেছেন। অত্যাধুনিক সেই দোতলায় বিয়ের পর ছেলে ও বউমা বসবাস করতেন। বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় কৌশলী অজুহাতে বউমা স্বামীকে নিয়ে কৃষ্ণনগরে চলে গেলেন।

এখন প্রৌঢ়ত্বের কিনারে থাকা হরিপদ দাদা ও বৌদি মিলে কষ্টেসৃষ্টে জীবনের অবশিষ্ট সময় পার করছেন। গভীর দুঃখে হরিপদ দাদার স্ত্রী আমাকে বলেছেন, ‘ছেলেকে জন্ম দিলাম, পরম স্নেহে মানুষ করে তুললাম। আপনার দাদা তো ঢাকায়। আমি একা সন্তান দুটিকে সমাজে যোগ্য রূপে গড়ে তোলার পর যখন বউমা বলে আমরা নাকি আমাদের কর্তব্য করেছি, যেটা সব বাবা-মাই করে থাকেন। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী একান্তই স্ত্রীর, অন্য কারও নয়। স্বামীর প্রতি সব অধিকার একমাত্র স্ত্রীরই। আরও বলেছে, অকারণে মায়াকান্না করে আমার স্বামীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবেন না।’ ছেলে চলে যাওয়ার পর থেকে বউদি প্রচণ্ড রকম ভেঙে পড়েছেন। তবে হরিপদ দাদা বাস্তবতা মেনে স্ত্রীর পাশে থেকে সংসারের যাবতীয় কর্তব্য করে যাচ্ছেন।

বিক্রমপুরের ফটিক দের নিউ আলীপুরের বাসায় গিয়েছিলাম। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে মওলানা ভাসানীর সংগঠনে সক্রিয়ভাবে যুক্ততার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর পালিয়ে কলকাতায় চলে যান। দেশে না ফিরে ওখানেই স্থায়ী হয়ে গেছেন। সরকারি চাকরি করতেন। এখন অবসরে। নিউ আলীপুরে পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাট কিনে একত্রে একটি বড় ফ্ল্যাট করে সেখানেই স্বামী-স্ত্রী বসবাস করছেন। তাঁর বাসা চিনতে অসুবিধা হচ্ছিল, তাঁকে ফোন করলে তিনি নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়াতে বলে প্রায় ছুটে এসে আমাদের দোতলার ফ্ল্যাটে নিয়ে ওঠেন। ঘরে ঢোকামাত্র গৃহকর্মী বলে ওঠে, ‘জল নেই, জল ছেড়ে আসো।’ ফটিক দে আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে গেলেন জল ওঠানোর মেশিন ছাড়তে। অল্প পরেই ফিরে এলেন। ওই গৃহকর্মীর ওপর অধিক নির্ভরশীলতার সুযোগেই গৃহকর্মীটি আদেশের সুরে তাঁকে জল তোলার নির্দেশ দিয়েছে। তাঁর স্ত্রী অসুস্থ। এক মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ে স্বামীর সংসারে আর ছেলে বিয়ের পর যৌথ পরিবার ত্যাগ করে স্ত্রীকে নিয়ে পৃথক ফ্ল্যাটে বসবাস করছে। ছেলে ও বউমাকে নিয়ে একত্রে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন, সেই আশায় দুটি ফ্ল্যাটকে একত্র করে বড় একটি ফ্ল্যাট করেছিলেন। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে, ডাক্তারের কাছে তাঁকেই ছুটতে হয়। সংসারের সমস্ত কাজ নিজেই করেন। এমনকি রান্নার কাজও। গৃহকর্মীটি কেবল ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, থালাবাসন পরিষ্কারের কাজ করে। বাকি সমস্ত কাজ বৃদ্ধ বয়সে তাঁকেই করতে হয়। ছেলের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিলাম। ছেলের প্রশংসা করলেও বিয়ের পর ছেলের ওপর আর তাঁদের অধিকার থাকেনি। বউমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছেলের কিছুই করার জো নেই। তাই আক্ষেপে ফটিক দাদা বলেছেন, ‘আমাদের পশ্চিম বাংলার সিংহভাগ ছেলেই “পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক”।’

ছেলে-বউমা এবং শাশুড়িকে নিয়ে একত্রে বসবাসের পরিবারেও গিয়েছিলাম। বাড়িতে কাজের লোকের সমস্ত দায়িত্ব বৃদ্ধ শাশুড়িকেই পালন করতে হচ্ছে। অর্থাৎ, ঘরকন্নার সমস্ত কাজ। খুব মজা পেয়েছিলাম ভদ্রমহিলা যখন বউমার উপস্থিতিতে বউমা প্রসঙ্গে অনর্গল স্তুতি-প্রশংসা করে যাচ্ছিলেন। বউমার উপস্থিতিতে স্তুতি করা ছাড়া তাঁর অন্য উপায়ও ছিল না। পাছে বউমার আশ্রয় থেকে বিতাড়িত হতে হয়, এই আশঙ্কায়।

ফুলিয়া রেলস্টেশনে গামছা বিক্রেতা ঢাকার দোহারের একজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের দোহা আক্রমণের সংবাদ পেয়ে পুরো পরিবার সৈয়দপুর হয়ে কলকাতায় এবং পরে শান্তিপুরে স্থায়ী হয়েছে। তাদের পেশা ছিল তাঁতশিল্প। শান্তিপুরে গিয়ে তাঁতের পেশায় যুক্ত হয়ে স্বাধীনতার পর আর দেশে ফিরে আসেনি। সরকারি খাসজমিতে বন্দোবস্ত নিয়ে সেখানেই স্থায়ী হয়েছে। শিয়ালদা-শান্তিপুর লোকাল ট্রেনে গামছা ফেরি করেন। তাঁর বয়সও সত্তরের ওপরে। এই বৃদ্ধ বয়সে কেন এত কষ্ট করে যাচ্ছেন, ছেলেরা কী করে—এমন প্রশ্নে তাঁর মুখটি মলিন হয়ে ওঠে। দুই ছেলে এখানে তাঁতশিল্পের কারিগর। তিনিই তাদের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে তাঁতশিল্পে যুক্ত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। ছেলে দুজন স্থানীয় (তাঁর ভাষায় ঘটি) পরিবারে বিয়ে করে দ্রুতই বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে ত্যাগ করে পৃথক সংসার পেতেছেন। জীবন রক্ষায় বাধ্য হয়ে তাঁকে বৃদ্ধ বয়সে গামছার পোঁটলা কাঁধে নিয়ে ঘুরে ঘুরে গামছা বিক্রি করতে হচ্ছে।

পশ্চিম বাংলার পারিবারিক জীবনে আত্মকেন্দ্রিকতার সীমা-পরিসীমা নেই। সেখানে সবাই যার যার তার তার। পারিবারিক দায়িত্ব-কর্তব্য বলে কিছু নেই। পরিবারের দায়িত্ব চরম নিষ্ঠুরতায় এড়িয়ে পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোকেরা জন্মদাতা, প্রতিপালনকারী পিতা-মাতাকে অনিশ্চিত জীবনে ঠেলে কেটে পড়ছে, স্ত্রীর পরামর্শে-জেদে। বিশ্ব পুঁজিবাদী দর্শন ক্রমাগত বিস্তার লাভ করে মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতার অভিমুখে ঠেলে দিয়েছে। পুঁজিবাদ পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করারই দর্শন। এই দর্শনই পশ্চিম বাংলাজুড়ে ব্যাপক আকারে বিস্তার লাভ করেছে। তাই এর নৃশংস নমুনা 
দেখে এলাম। পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোকেরা ওই দর্শনেরই শিকার। স্ত্রীর প্ররোচনাও ওই পুঁজিবাদেরই দীক্ষা। সেই দীক্ষা বিচ্ছিন্নতার, সামষ্টিক ভাবনার বিপরীতে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার অভিমুখে বিরামহীন ছুটে চলা।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক নতুন দিগন্ত

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস