আমাদের বেড়ে ওটা অনেকটা পলিযুক্ত নরম কাদার মধ্যে পদ্ম কিংবা শাপলা ফুলের মতো। টবে ফোঁটা সার দেওয়া ফুলের মতো নয়। সূর্যের একান্ত প্রশ্রয়ে আপসে নিজস্ব খেয়ালে ফুটে ওঠা শতদলের মতো। বাংলার সরল প্রকৃতির মতোই আমাদের বেড়ে ওঠা। চারদিকে বাঁশঝাঁড়, বেতঝাঁড়, আম, জাম, কাঁঠাল, তেঁতুল, দেবদারুসহ বিচিত্র গাছপালা। ঝোপঝাঁড়ে নানা রকম পাখি আর তাদের ডাক। অন্যদিকে পুকুর, বাওড়, বিল-ঝিল, নদী আর গোঁয়ার প্রকৃতি। এছাড়া, নানা পেশার মানুষ। বিশেষ করে ফসল উৎপাদনকে যারা ইবাদতের মতো মনে করেন সেইসব খেটে খাওয়া মানুষ। বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বুঝতে পারলাম এটাই বাংলাদেশ। প্রকৃতি এবং মানুষের মধ্যে যে-এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে তার সন্ধান পেলাম প্রথম শিক্ষাগুরু আমার বাবা কবিরত্ন এম এ হকের (১৯২৯-২০০৬) কাছ থেকে।
তিনি অন্য সকলের কাছে ‘কবি স্যার’ নামেই পরিচিত ছিলেন। আক্ষরিক অর্থে, বাবা ছিলেন আপদমস্তক একজন কবি এবং শিক্ষক। কারণ তিনি সাহিত্য এবং শিক্ষকতাকে একান্ত নেশা হিসাবে নিয়েছিলেন। যা আমার চারপাশে দেখা একটি বিরল ঘটনাই বটে। বাবার ঘুম ভাঙত পাখির ঘুম ভাঙার মতোই। কারণ তিনি রাতের শেষ প্রহরে ঘুম থেকে উঠতেন। হারিকেন বা কুপি জ্বালিয়ে কবিতা বা গান লিখতেন আপন খেয়ালে। আযানের পর আমাদের ডেকে তুলতেন। আমাদের প্রথম প্রথম বিরক্তিকর মনে হলেও পরে তা অভ্যস্ততায় পরিণত হয়। পরে মনে হতো কোন অতি পরিচিত পাখির ডাকেই যেন ঘুম ভাঙছে। এখনো যেন তা জীবনের সাথে জড়িত এবং জারিত হয়ে আছে। আপসে ঘুম ভেঙে যায়। আমাদের ডাকতেন আর বলতেন, ‘সকাল বেলার হাওয়া/হাজার টাকার দাওয়া’। চারিদিক ফর্সা হলে বিশেষ করে আমাকে নিয়ে যেতেন বাড়ির পুব পাশে ; যেখানে বিস্তীর্ণ মাঠ ও বড় বিল। যার মাঝখান দিয়ে সরুপথ অন্য গ্রামের সাথে মিশে গেছে। যার দুইপাশে যেন ঘাসের মোজাইক করা। আমাদের যেতে হতো খালি পায়ে। বাবা বলতেন, ‘খালি পায়ে হাঁটলে চোখের জ্যোতি ভালো থাকে এবং মাটি যে মায়ের মতো তার উপলব্ধি প্রবল হয়।’ আমরা শিশির মাড়িয়ে যেতাম বিলের ধারে। বাবা বলতেন, ‘দেখছিস ঘাসের আগায়, মটরশুটির পাতায় শিশিরকে কেমন মুক্তার মতো দেখাচ্ছে?’ তাৎক্ষণিক তিনি কবিতার ভাষায় বলে উঠতেন, ‘অরুণ কিরণে শিশির বিন্দু মুক্তার মতো ঝিকিমিকি করে।’ তারপর সূর্য, শিশির, মাটি, প্রকৃতির নানা বিষয় নিয়ে তিনি বিস্তর বলে যেতেন। মনে হতো যেন প্রকৃতি তার ছদ্মবেশ একে একে খুলে দিচ্ছে আর অজস্র প্রশ্ন জড়ো হচ্ছে আমার বুকের ভেতর। জাদুমন্ত্রের মতো মেলে ধরতেন প্রকৃতি আর ঋতু বৈচিত্র্যের ভেদ। অবশ্যই তা থাকত দার্শনিকতায় টইটুম্বুর। পরবর্তীতে আমার আল মাহমুদের সেই বিখ্যাত কবিতার মতোই মনে হয়েছে, ‘প্রকৃতির ছদ্মবেশ যে-মন্ত্রেই খুলে দেন খনা/ একই জাদু আছে জেনো কবিদের আত্মার ভিতরে।’ বাবার কবিমানস যেন জাদুমন্ত্রের মতো প্রকৃতির ছদ্মবেশ খুলে দিয়েছে আমার পলিমাটির মতো কোমল চোখের সামনে। বাবার বেশ কিছু প্রকৃতি নির্ভর কবিতা ও গান আমাকে এখনো পুলকিত করে এবং লিখতে প্রেরণা জোগায়।
বাবা বিকাল হলেই আমাকে হাত ধরে নিয়ে যেতেন মধুমতী নদীর কূলে। নদী নিয়ে নানা কথা শোনাতেন। এর উৎপত্তি, সমাপ্তি এবং এর সৌন্দর্যের বর্ণনা শোনাতেন। মাঝেমাঝে নদীর কিনারে খেলা করতাম আর বাবা কবিতা, গান লিখতেন। মনে পড়ে বাবার নদী নিয়ে বেশ কিছু গানের সংকলন আছে। তিনি একটি গানের বই লিখেছিলেন যার নাম ‘এপার-ওপা’র। গানগুলোর প্রতি মুগ্ধ হয়ে কবি জসীমউদ্দীন ও কবি সুফি মোতাহার হোসেন ভূমিকা লিখে দেন।
বাবা নানা সময় দেশের গুণী মানুষদের সাথে তাঁর সখ্যের কথা শোনাতেন। যেমন, ড. এনামুল হক, মুনীর চৌধুরী, ইতিহাসবিদ কে. আলী। এঁরা বাবার শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু চিন্তার স্বরাটতায় তাঁদের নিবিড় সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন। এছাড়া কবি জসীমউদ্দীন, কবি সুফি মোতাহার হোসেন, কবিয়াল বিজয় সরকারসহ আরো গুণী মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন বন্ধুতা। পরবর্তীতে এঁদের লেখা বই, গান পড়ে বাবার প্রতি অভিভূত হওয়ার মাত্রা বেড়েই চলছে। এছাড়া বাবার প্রতি অভিভূত হয়ে চেয়ে থাকতাম। কীভাবে পাড়াগাঁয়ে প্রান্তিক জীবন-যাপন করে একজন ব্যক্তি ‘যশোর সাহিত্য সংঘ’ থেকে ‘কবিরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হতে পারেন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে। এটা আমার কাছে বিস্ময়ই মনে হতো। এছাড়া প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ কর্তৃক বাংলা উন্নয়ন বোর্ডে বাবার কবিতা এবং জীবন বৃত্তান্ত সংকলনে স্থান করে নিয়েছিল। এবং পাকিস্তান আমলে প্রাইমারি স্তরে কচি মনের খোরাক নামে একটি দ্রুতপঠন পাঠ্য হিসাবে চালু ছিল।
আর একটি বিষয় এখনো আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয় এবং চিন্তাকে ধাক্কা দেয় তা হলো, তাঁর বই পড়ার বিস্তার এবং গভীরতা। আমাদের গ্রামাঞ্চলে এমন একটা সময় ছিল যে, আমরা বই বলতে শুধু পাঠ্যবইকেই বুঝতাম। এর বাইরে যে বইয়ের বিশাল জগত আছে তা আমাদের চিন্তাতীত ছিল। নির্মম হলেও সত্য, হাতে গোনা দুই-একজন শিক্ষক ছাড়া কেউই আমাদের সেই জগত সম্পর্কে তেমন কিছুই বলতেন না। কিন্তু বাবাকে দেখেছি তিনি সারাক্ষণ বই পড়ার মধ্যে ডুবে থাকতেন। আর লিখে যেতেন হরদম। এমনকি তিনি দূর-দূরান্ত থেকে বই ধার করে এনে পড়তেন। পাঠ্যবইয়ের বাইরে যে আরো ব্যাপক জ্ঞানভাণ্ডার আছে তা বাবার কাছ থেকেই জেনেছি। আর বলে রাখা দরকার, লাইব্রেরি বলতে বুঝতাম স্কুলে শিক্ষকদের বসার স্থান আর বাজারে পাঠ্যবই এবং গাইড বিক্রির দোকান। এখনো সেই চল ব্যাপকভাবে রয়ে গেছে। আমার এই বদ্ধ ধারণার মুক্তিদাতা হলেন বাবা। বাবার পাণ্ডিত্য এত গভীর ছিল যে, মনে হতো তিনি যেন একটা ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি।
বাবা যেহেতু হাই স্কুলে শিক্ষক ছিলেন সেহেতু বিভিন্ন গ্রাম থেকে জ্ঞানপিপাসু মানুষ আসতেন তাঁর সাথে নানা আলাপ আলোচনায় সামিল হতে। তিনি যখন ইতিহাসের কোন বিষয় নিয়ে আলাপ করতেন, তখন মনে হতো তিনিই যেন ঐ ইতিহাসের চরিত্র হয়ে উঠে এসেছেন বর্তমানের মঞ্চে। সে এক অদ্ভুত সম্মোহন তৈরি হতো। বাবার কাছ থেকেই আমি প্রথম জেনেছি ইতিহাসে মিথ এবং বাস্তবতার ভেদ আছে। বাবা কোন বিষয় সম্পর্কে কথা বললে সাধারণ বিষয় থেকে অসাধারণের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। তাঁর পাণ্ডিত্যের রোশনাই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি ধর্ম বিষয়ে পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। মনে পড়ে, বাবা মুসলিম ধর্মসভায় বিশেষ বক্তা হিসাবে যেমন ওয়াজ করতেন, তেমনি হিন্দু ধর্মসভায় বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য দিতেন। এলাকায় তিনি ‘যুক্তিবাদী’ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এটা আমার দেখা একটি বিরল ঘটনাই বটে। এছাড়া নিজের একান্ত আগ্রহে ডাক্তারিকে পেশা হিসাবে না নিয়েও হোমিওপ্যাথি ও অ্যালোপ্যাথি সার্টিফিকেট অর্জন করেছিলেন। তিনি এলাকার অসহায় মানুষদের বিনা পয়সায় সেবা দিয়ে সহায়তা করতেন। এটাও ছেলেবেলায় আমাকে বেশ আন্দোলিত করত। এখন ভাবি, মানুষ যেখানে পুঁজির কাছে প্রতিদিন বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, পুঁজি যেখানে প্রতিদিন মানুষের সম্ভ্রম নষ্ট করছে সেখানে বাবার মধ্যে এ রকম নির্মোহতা এক বিস্ময়ই বটে। যদিও বড়ো মানুষের জীবনী পড়তে গেলে এ রকম দৃষ্টান্ত চোখ এড়ায় না। এখন মনে হয়, এটা বড় হওয়ার পূর্বশর্ত-ই বটে।
সামগ্রিকভাবে ব্যক্তি নিজেকে তখনই অতিক্রম করতে সক্ষম হন যখন ব্যক্তির আদর্শ এবং যাপনে এক অনন্য স্বরাটতা ধরা দেয়। বাবা সত্যিকার অর্থে আদর্শ আর যাপনের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য রসায়ন তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাই তো তাঁকে এবং তাঁর কাজকে মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। তবে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, প্রান্তিকে যাঁদের মনীষা আছে, সমাজে যাঁদের অবদান আছে, তাদের সসম্মানে তুলে আনলে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির চরিত্র উৎকর্ষের দিকে যাবে এবং জাতি উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি অর্জন করবে। অবশ্যই এ প্রকল্প হাতে নেওয়ার উৎকৃষ্ট সময় এসেছে বলে মনে করি। বাবার এই প্রয়াণ দিবসে সংস্কৃতির সংকটকালে একথা বারবার মনে হচ্ছে।
লেখক: কুদরত-ই-গুল, শিক্ষক