হোম > ছাপা সংস্করণ

প্রবীণ সাহিত্য এখন সময়ের দাবি

হাসান আলী

বলা হয়ে থাকে সাহিত্য সমাজের আয়না। সেই আয়নায় প্রবীণের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সফলতা-ব্যর্থতা, সম্মান-অসম্মান কতখানি দেখা যায়, তা নিয়ে কথা বলার অবকাশ রয়েছে।

কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, প্লেগ, কালাজ্বরের মতো মহামারি, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগে গড় আয়ু কমিয়ে রেখেছিল মানুষের মৃত্যু। ফলে মানুষ প্রবীণ হওয়ার সুযোগ তেমন একটা পেত না। যাঁরা প্রবীণ হতেন, তাঁরা সম্মান-মর্যাদা খানিকটা বেশি পেতেন। 
সমাজে প্রবীণ মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক অনেক কম থাকায় সাহিত্যে তাঁদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আমাদের নজরে পড়ে না।

সাহিত্যের প্রধান চরিত্রগুলোতে তরুণ-তরুণীদের প্রচণ্ড দাপট ছিল। সমাজ তখন অনেকখানি তরুণনির্ভর থাকায় তরুণ-তরুণীদের সুখ-দুঃখ, বিরহ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিগুলো সাহিত্যের বড় অংশ দখল করে রেখেছিল।

অল্প কিছুসংখ্যক মানুষ প্রবীণ হওয়ার সুযোগ পেতেন, আবার তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী। এই প্রবীণ নারীরা সমাজে, পরিবারে খানিকটা অসম্মান, অপমানের শিকার হতেন। তাঁদের সমাজ ও পরিবারে ‘বুড়ি’ হিসেবে সম্বোধন করা হতো। বিভিন্ন ধরনের প্রবাদ দ্বারা তাঁদের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করা হতো।

কানা বুড়ি, চরকা বুড়ি, কুটনি বুড়ি, কুঁজো বুড়ি, উকুনে বুড়ি, পেতনি বুড়ি, ডাইনি বুড়ি—এসব বলে প্রবীণ নারীর চলাফেরা, আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। নেতিবাচক পরিচিতি দিতে বলা হতো—চাল নষ্ট মুড়ি আর পাড়া নষ্ট বুড়ি; বিশেষ করে পরিবারের তরুণ সদস্যরা 
প্রবীণ নারীদের প্রতি অনেক সময় শোভন আচরণ করত না। ফলে প্রবীণ নারীরা রাগে-দুঃখে, অসম্মান-অপমানে অভিযোগ, নালিশ, অভিশাপ দিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতেন।

প্রবীণ পুরুষদের হাতে জমিজমা, সহায়-সম্পদ থাকায় তেমন একটা বিড়ম্বনার শিকার হতে হতো না। তাই সাহিত্যে তাঁদের উপস্থিতি খানিকটা মর্যাদা এবং সম্মানের। যেমন ‘একতাই বল’ গল্পে দেখানো হয় একজন প্রবীণ ব্যক্তির ছেলেরা একে অপরের বিরুদ্ধে ঝগড়া-বিবাদ, মারামারিতে লিপ্ত রয়েছে। একদিন প্রবীণ ব্যক্তি তাঁর ছেলেদের হাতে একটি করে কাঠি তুলে দিয়ে ভাঙতে বলেন। সবাই মট মট করে কাঠি ভেঙে ফেলল। এবার প্রবীণ পিতা অনুরূপ কাঠি সবার হাতে দিয়ে সবগুলো কাঠি একত্র করে আঁটি বেঁধে ভাঙতে বললেন।

কেউই আঁটি ভাঙতে পারল না। পিতা ছেলেদের শেখালেন যে ‘একতাই বল’। এখানে প্রবীণ পুরুষকে জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আমাদের শিশুসাহিত্যে বহু বছর ধরে প্রবীণ নারীর অক্ষমতা, অসহায়ত্বকে শিশু শিক্ষার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশুদের কাছে জনপ্রিয় পান্তা বুড়ি, উকুনে বুড়ি, কুঁজো বুড়ির গল্প। উকুনে বুড়ি স্বামীকে ভাত দেওয়ার সময় মাথা থেকে থালায় উকুন পড়ে। এতে তার স্বামী তাকে মারলে সে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। পরে এক বক বুড়িকে রাঁধুনি হিসেবে কাজ দেয়। একদিন রান্না করতে গিয়ে সে চুলার আগুনে পুড়ে মারা যায়।

কুঁজো বুড়ির গল্পে দেখা যায়, বুড়ি খাবারের অভাবে নাতনির বাড়ির উদ্দেশে রওনা করে। বাড়িতে রেখে যায় প্রিয় তিনটি কুকুর। পথে বাঘ, শিয়াল তাকে খেতে চায়। বুড়ি জানায়, তার গায়ে এখন মাংস নেই, নাতনির বাড়ি খেয়েদেয়ে মোটাতাজা হয়ে ফেরার পথে খেলে বেশি লাভ হবে। নাতনির বাড়ি খেয়েদেয়ে মোটাতাজা হয়ে লাউয়ের খোলে ঢুকে বাঘ, শিয়ালের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়ি চলে আসে। পান্তা বুড়ির গল্পে বুড়ির পান্তা রাতে চোর চুরি করে খেয়ে ফেলে। চোর ধরতে গোবর, ছুরি, বেল বুড়িকে সহযোগিতা করে।

এই তিনটি গল্পে প্রবীণ নারীর নিঃসঙ্গতা, অসহায়ত্ব, অক্ষমতাকে তুলে ধরা হয়েছে। শিশুর মানসিক বিকাশে এসব কী ভূমিকা রাখবে, সেটা বিবেচনা করার সময় হয়েছে।

খ্যাতিমান ইংরেজ কবি উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ার রচিত ‘ক্র্যাবড এইজ অ্যান্ড ইয়ুথ’ কবিতার মধ্য দিয়ে কবি যৌবন এবং বার্ধক্যের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। বার্ধক্যকে শীতকাল এবং যৌবনকে গ্রীষ্মকাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বার্ধক্য অক্ষম-অচল।

অপরদিকে যৌবন চপল-চঞ্চল। কবি বার্ধক্যকে ঘৃণা করেছেন, অপরদিকে যৌবনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সে জন্যই বার্ধক্য আড়াল করার সংস্কৃতি জোরদার হচ্ছে কি না, সেটা আমাদের চিন্তা করতে হবে।

নোবেলজয়ী আমেরিকান লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ১৯৫২ সালে রচনা করলেন ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ নামের কালজয়ী উপন্যাস।উপন্যাসের নায়ক সান্তিয়াগো ৮৫ বছর বয়সী কিউবান মৎস্য শিকারি। স্ত্রী বেঁচে নেই। একাকী থাকেন। তাঁর মেনোলিন নামে কমবয়সী এক শিষ্য ছিল। মেনোলিন সান্তিয়াগোর কাছে মাছ ধরা শেখে, গল্প শোনে, দৈনন্দিন কাজকর্মে সহযোগিতা করে। বিনিময়ে খাবার ও পোশাক পায়। সান্তিয়াগো ৮৪ দিন একটি মাছও ধরতে না পারায় মেনোলিনের পিতা-মাতা হতাশ হয়ে পড়েন।

মেনোলিন সান্তিয়াগোকে অনেক পছন্দ করত, তাই ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। অবশেষে ৮৫ দিনে সান্তিয়াগো মারলিন নামের বিশাল একটি মাছ বড়শিতে আটকে ফেললেন। মাছের ক্ষিপ্রতা, শক্তি, চালাকি বৃদ্ধ সান্তিয়াগোর দক্ষতা, ধৈর্য, বুদ্ধির কাছে হেরে গেল। কিন্তু মারলিনের রক্ত সমুদ্রের পানিতে ছড়িয়ে পড়ায় হাঙরের দল মারলিনের শরীরের প্রায় সবটুকু খেয়ে ফেলে। বৃদ্ধ সান্তিয়াগো হাঙরের হাত থেকে মাছ রক্ষা করতে পারেননি।সমুদ্রতীর থেকে মাছের কঙ্কাল টেনে বাড়ির দিকে আনলেন। উপকূলবাসী এর আগে এত বড় মাছের কঙ্কাল দেখেনি।

আমরা এই উপন্যাসে একজন হার না-মানা প্রবীণ বীরকে দেখতে পাই, যিনি প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন। নিঃসঙ্গতা, হতাশা, সমালোচনা, ক্লান্তি তাঁর কাছে পাত্তা পায় না।

খ্যাতিমান ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরের বিখ্যাত নাটক ‘দ্য মাইজার’ বাংলাদেশে ‘কঞ্জুস’ নামে সর্বাধিক মঞ্চায়িত হয়েছে। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এই নাটকের মূল চরিত্র হলো কৃপণ হায়দার আলী খান। তিনি ৭০ বছর বয়স অতিক্রম করেছেন। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হায়দার আলী টাকাপয়সা খরচ করার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক। হাসি-ঠাট্টার ছলে একজন প্রবীণকে সমাজের চোখে হাস্যাস্পদ করার চেষ্টা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। কারও বৈধ অর্জিত টাকাপয়সা কাকে দেবে না দেবে, এটা ব্যক্তির ইচ্ছা বা অনিচ্ছা। কাউকে কৃপণ বলে হেয় করার সুযোগ নেই।

এ ধরনের নাটক থেকে তরুণদের মধ্যে প্রবীণবিদ্বেষী অশ্রদ্ধার মনোভাব তৈরি হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। বাপের হোটেলে থাকা-খাওয়ার মনোভাব শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকে পরনির্ভরশীল করবে।

বাংলা সাহিত্যে প্রবীণ জীবনকে দার্শনিকভাবে তুলে ধরেছেন মরমি কবি হাসন রাজা। তাঁর কালজয়ী রচনা, ‘লোকে বলে, বলে রে ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার/…আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার/ এই ভাবিয়া হাসন রাজা ঘরদুয়ার না বান্ধে, কোথায় নিয়া রাখবো আল্লায় তার লাগিয়া কান্দে...’।

পার্থিব সম্পদ আহরণ, সংরক্ষণ, বৃদ্ধিতে মানুষের মধ্যে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে তা থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করার প্রেরণা এই গান থেকে পাওয়া যেতে পারে।

প্রবীণ জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম। তিনি রচনা করলেন স্মরণকালের জনপ্রিয় গান,
‘আগের বাহাদুরি এখন গেল কই/ চলিতে চরণ চলে না, দিনে দিনে অবশ হই/ মাথায় চুল পাকিতেছে, মুখের দাঁত নড়ে গেছে/ চোখের জ্যোতি কমেছে, মনে ভাবি চশমা লই/ মন চলে না রং-তামাশায়, আলস্য এসেছে যে হায়/ কথা বলতে ভুল পড়ে যায়, মধ্যে মধ্যে আটক হই...’।

আমাদের দেশে শিশু-কিশোর উপযোগী লেখা তৈরি করার জন্য শিশু-কিশোর সাহিত্যিকেরা রয়েছে। এসব লেখার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।শুধু প্রবীণদের জন্য আলাদা করে সাহিত্যচর্চা নেই। প্রবীণ সাহিত্য নিয়ে কথা উঠলে কেউ কেউ যুক্তি তুলে ধরে বলেন, অমুকের অমুক লেখায় প্রবীণ বিষয় রয়েছে। প্রবীণের পক্ষে বিশাল সাহিত্যভান্ডার থেকে নিজের উপযোগী সাহিত্য খুঁজে বের করা খুবই কঠিন বিষয়।

প্রবীণের মানসিকতা, চাহিদা, বিনোদন বিবেচনায় নিয়ে প্রবীণ সাহিত্য তৈরি করা সময়ের দাবি। বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি প্রবীণের বসবাস। তাঁদের জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ, সংকট, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, প্রেম, বিরহ, ব্যথা-বেদনা, নিঃসঙ্গতা সাহিত্যে তুলে আনাই লেখকদের একটা কাজ হতে পারে। দুই কোটি প্রবীণের জীবন কবি-সাহিত্যিকের বিবেচনার বাইরে থাকলে তা হবে বয়সবিদ্বেষী মনোভাব। লেখক, প্রকাশকেরা উদ্যোগ নিয়ে আলাদা করে প্রবীণ সাহিত্য হিসেবে নতুন ধারা চালু করতে পারেন।

নানা কারণে প্রবীণের চলাচল সীমিত হয়ে যায়। সশরীরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুযোগ কমতে থাকে।ফলে বই, পত্রিকা, টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেসবুকের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। অথচ পত্রিকায় আলাদা প্রবীণ পাতা নেই, টেলিভিশনে প্রবীণদের দুঃখ-দুর্দশাই বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়। বার্ধক্যকে উপভোগ করার ক্ষেত্রে সাহিত্য বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা প্রবীণ উপযোগী সাহিত্য রচনায় এগিয়ে আসবেন—এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: প্রবীণ বিষয়ে লেখক, গবেষক ও সংগঠক

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস