বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা গবেষণা ও সংরক্ষণ এবং প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে ১১ বছর আগে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় প্রতিষ্ঠা করা হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (আইএমএলআই)। তবে প্রতিষ্ঠার এত দিনেও উদ্দেশ্য পূরণে যথার্থ কোনো কার্যক্রমই হাতে নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। নাম রক্ষা করছে শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে হাতে গোনা ভাষাসংক্রান্ত কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আর উল্লেখযোগ্য গবেষণা কার্যক্রম না থাকায় ২০১৫ সালের নভেম্বরে ইউনেসকোর ক্যাটাগরি-২ ইনস্টিটিউটের স্বীকৃতি পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটির স্বীকৃতি বাতিল হওয়ারও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠার সময়ে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের জন্য ২৩টি কাজ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে চার-পাঁচটি পুরোপুরি এবং কয়েকটি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কাজ ছিল দেশে-বিদেশে বাংলা ভাষা প্রচার ও প্রসারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো স্বাধীনতার ৫০ বছর এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠার ১১ বছর পার হলেও দেশে একটি ভাষানীতি প্রণয়ন হয়নি। দাপ্তরিক কাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসসহ অনেক জায়গায় এখনো ইংরেজির দাপট বাংলার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
এ ছাড়া পাঁচ বছর আগে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন ভাষার লিখনবিধির আর্কাইভ ও একটি ভাষা-জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু যথাযথ প্রচারের অভাবে সেখানে দর্শনার্থীর আনাগোনা নেই বললেই চলে।
এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি শাখায় পরিণত হচ্ছে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটটি। আইএমএলআই ভবনে বর্তমানে শিক্ষামন্ত্রীর কার্যালয় করা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এই ভবনেই অনেক সময় দাপ্তরিক কাজ করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। আর ভবনটিতে বিভিন্ন সময় মন্ত্রণালয়ের সভা-সেমিনার থাকে। পাবলিক পরীক্ষার ফল ঘোষণা, স্কুলে ভর্তি লটারির উদ্বোধন ইত্যাদি বড় বড় আয়োজনও হচ্ছে এখানেই।
প্রত্যাশিতভাবে বাংলা ভাষার প্রসার হয়নি বিদেশেও। জনসংখ্যা ও ব্যবহারের দিক দিয়ে বাংলা ভাষা বিশ্বে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকলেও জাতিসংঘে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে এখনো যুক্ত করা হয়নি। এখন সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন, বুলেটিন আর জার্নাল প্রকাশ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন, ভাষা পদক প্রদানেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠিত মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম।
তবে শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের বাংলা উচ্চারণ ও বানান শেখানোর কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া গত এক দশকে দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা নিয়ে ‘নৃ-ভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ কাজটি শেষ করা হয়েছে। কিন্তু এখনো এই সমীক্ষার ফল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো প্রকাশনা নেই।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটি যে লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার অনেকটাই অর্জন হচ্ছে না গবেষক ও দক্ষ জনবল সংকটের কারণে। জনবল কাঠামো অনুযায়ী, ১৭টি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার পদসহ মোট ৯৮টি অনুমোদিত পদ আছে। তবে বর্তমানে কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে এখানে ৭০ জন কাজ করছেন। এমনকি এখন পর্যন্ত কোনো গবেষক এখানে নিয়োগ পাননি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক (সেমিনার, পরিকল্পনা ও ভাষা-জাদুঘর) মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, ‘ইনস্টিটিউট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শাখায় পরিণত হচ্ছে, এ বিষয়টির সঙ্গে আমি একমত নই। ভাষা নিয়ে কাজ হচ্ছে না তা-ও নয়। এখানে সেমিনার, কর্মশালাসহ নানা আয়োজন হচ্ছে।’
নৃ-ভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার অগ্রগতি নিয়ে আবু সাঈদ বলেন, ‘সমীক্ষা শেষে ১০টি করে বই প্রকাশ করার কথা থাকলেও ১টি প্রকাশ হয়েছে। তবে আমি তখন এখানে কর্মরত ছিলাম না। তাই বলতে পারছি না কেন প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেছে।’ তবে ভাষা নিয়ে সামনে আরও ভালো গবেষণা হবে বলে জানান আবু সাঈদ।