২৩ মার্চ ওরা এটাকে পাকিস্তান দিবস হিসেবে পালন করত। পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতি থাকলে তিনি, না থাকলে গভর্নর বা তাঁর প্রতিনিধিত্ব যিনি করতেন, তিনি সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজের অভিবাদন নিতেন। সারা দেশে পাকিস্তানের পতাকা উড়ত। আমরা স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তরফ থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ইশতেহারের মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম যে ২৩ মার্চ পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়বে।
আমরা ইশতেহার দিয়ে, বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে ৩ মার্চ স্বাধীনতার পরিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলাম। কিন্তু ২১-২২ তারিখের কোনো একটি সময় আমাদের, তখন প্রতিদিনই একেকটা সিদ্ধান্ত আসত, কিছু আসত বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে। যে কথাটা সংসদীয় রাজনীতির কারণে তিনি বলতে পারতেন না, বাধানিষেধ ছিল, যেমন ২৩ মার্চ পাকিস্তানের পতাকা উঠবে না স্বাধীন বাংলার পতাকা উঠবে—এ কথাটি তাঁর শাসনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতার জন্য তিনি বলতে পারতেন না, তাতে তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত করা হতো। তারা কর্নওয়ালিসকে এনেছিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হতেন না। কিন্তু একটি মুহূর্তের জন্যও আওয়ামী লীগের তরফ থেকে বলা হয়নি কর্নওয়ালিসকে, ফেরত যাও। কারণ, আমরা সব সময় জানতাম তারা ২৫ মার্চ হোক, ২৬ মার্চ হোক, ২৭ মার্চ হোক আমাদের বুকে আক্রমণ করবেই। তারা সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র আনছিল। জাহাজ বোঝাই করে সৈন্য আনছিল। আমরা কিন্তু সবকিছু অবহিত ছিলাম। কিন্তু তারপরও এই খেলাটার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা যেমন তাদের অস্ত্রকে শক্তির বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছে, তারা যেমন বিশ্বাস করত যে এই নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করলেই, তাদের ওপর নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেই আন্দোলন নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, আমরা বিশ্বাস করতাম জনগণকে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ করতে পারি, একটি চেতনার মোহনায় এনে দাঁড় করাতে পারি, তাহলে ওদের ওই অস্ত্রের শক্তিকে এই নিরস্ত্র মানুষই মোকাবিলা করবে। সে কারণেই ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলনের সিদ্ধান্তটি স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আসে এবং আমি বহু অনুষ্ঠানে বলেছি, বহুবার বলেছি এবং এটা আমি বলতেই থাকব যে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শুধু একটি আন্দোলন পরিচালনা করার কোনো সংগঠন ছিল না; বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের প্রতিধ্বনি ছিল।
২৩ মার্চ ঘোষণা দেওয়ার পরে আমরা ওদের, ওদের শক্তিকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ করার জন্য কর্মসূচি দিলাম—পল্টন ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উঠবে, ব্যান্ড বাজবে, কুচকাওয়াজ হবে। যে কুচকাওয়াজ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হতো, সেই কুচকাওয়াজ হবে। জয় বাংলা বাহিনী দ্বারা বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসভবন পর্যন্ত যাবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা বঙ্গবন্ধুর হাতে প্রদান করা হবে। সেদিন মঞ্চে আমরা চারজন দাঁড়ালাম। আমাদের খসরু, মন্টু, সেলিম এরা জয় বাংলা বাহিনীর জেনারেল সেজে, ব্যান্ড বাজছে এমন অবস্থায় পতাকাটা নিয়ে মার্চপাস্ট করে গেল। আমরা অভিবাদন নিলাম। তারপর পল্টন থেকে শুরু করে বিরাট শোভাযাত্রা, তখন ওই কুচকাওয়াজ আর থাকল না, জনতার এক বিশাল জনসমুদ্র হয়ে গেল।
বঙ্গবন্ধু নিচে নেমে এলেন গেটের কাছে। আসার পরে ছোট পরিসরে লাখ লাখ লোক, ওর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের সেই সামরিক ভাব যে আমরা ওদের মোকাবিলা করব নিয়ে পতাকাটা তুলে দিলাম এবং হাইকোর্ট থেকে শুরু করে, প্রধান বিচারপতির বাসভবন থেকে শুরু করে, সচিবালয় থেকে শুরু করে, বাঙালিদের ৯৯ ভাগ গৃহে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই পতাকা—৫৪ হাজার বর্গমাইলের মানচিত্র আঁকা স্বাধীন বাংলার পতাকাটি উড়ল। কিন্তু মিরপুর আর মোহাম্মদপুরে অবাঙালি-অধ্যুষিত এলাকায় পাকিস্তানের পতাকা উড়ল। আমরা বেদনাহত চিত্তে তা লক্ষ করলাম। তার পরপরই আমরা ইশতেহার দিয়ে দিলাম, যারা ২৩ মার্চকে সম্মান করেনি, পতাকা দিবসকে সম্মান করেনি, যারা এখনো পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতীতি ঘোষণা করছে, তাদের গ্যাস, ওয়াসা এবং বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দাও। এ কথাটা কোনো সংসদীয় দলের নেতার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমরা ২৩ তারিখে বললাম ২৪ তারিখে প্রকাশ পেল। সঙ্গে সঙ্গে তাদের সব বিদ্যুৎ-সংযোগ, তাদের সব গ্যাস-সংযোগ এবং পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
আমরা কিন্তু বলিনি মোহাম্মদপুরের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দাও। যাঁরা বিচ্ছিন্ন করেছেন, তাঁরা জানতেন যে এই দুই এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিতে হবে। তখন তাদের কমিউনিটি লিডার তাদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে বলতে বাধ্য হলো যে আমরা স্বাধীনতার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করব, একাত্মতা ঘোষণা করব। তখন কিন্তু পরিষ্কার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে যে আমরা স্বাধীন হয়ে গেছি। যে যেখানে আছে বাঙালি সৈনিক, বাঙালি শ্রমিক, বাঙালি সচিব, বাঙালি সাংবাদিক, বাঙালি শিল্পপতি, বাঙালি ছাত্র—এই যে একটা আন্দোলনের স্রোতোধারার মধ্য দিয়ে একটা মিলনের মোহনায় এসে এক হয়ে যাওয়া এটা একটা অভূতপূর্ব দৃশ্য। প্রতিমুহূর্ত আমরা তাদের সিদ্ধান্তগুলো পেয়ে যাচ্ছি। ২৫ মার্চের বিকেলে জনতা ব্যাংকের সাধারণ সম্মেলনের প্রধান অতিথি হিসেবে বায়তুল মোকাররমে একটা মিটিং হলো, তার আগেই আমরা খবর পেলাম ২৫ মার্চে ক্র্যাকডাউন হবে, ওরা নামবে। আমরা জানতাম ওরা আমাদের আক্রমণ করবে। এ জন্য আমি ওখানে ঘোষণা দিলাম যে পরাধীন বাংলায় বা পাকিস্তান সামরিক বাহিনী-অধ্যুষিত এই বাংলায় এটাই আমার শেষ বক্তৃতা। আল্লাহ তৌফিক দিলে ইনশা আল্লাহ স্বাধীন বাংলায় আপনাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হবে।
আমার মনে আছে, মাখন, শহীদ, রশীদ, কাজী ফিরোজ, মহসীন, মাসুদ এস এম হলের জিএস আমরা তিনটা জিপ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম; বিশেষ করে আজকেই ক্র্যাকডাউন হবে, ডেফিনেট ইনফরমেশনটা যখন আমরা পেয়ে গেলাম, তখন ওই খবরটাও দেওয়া আমাদের লক্ষ্য ছিল। তো ওই খবরটা দিতে গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধু তাঁর বাসার ওই বারান্দায় পায়চারি করছেন। আমাদের দেখার পরে বললেন, শোন, ওরা কিন্তু আত্মসমর্পণ করেছে। আমার কাছে এসেছে অবাঙালিরা। তারাও এ দেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে চায়, তারাও প্রতীতি ঘোষণা করতে চায়। মাখন, আলম তোমরা গিয়ে ওদের কাছ থেকে এভিডেন্সটা নিয়ে নাও, ওদের আনুগত্যটা নিয়ে নাও। মোহাম্মদপুরে সলিমুল্লাহ সাহেবের বাসায় আমরা গেলাম (তিনি সাদি মোহাম্মদ, শিবলী মোহাম্মদের বাবা)। আমরা সেখানে যাওয়ার পর ওরা বলছে, ‘এ চৌধুরী সাবকো থোড়া আনা হ্যায়, ওতো রাহা মে হ্যায়, আতা হ্যায়, থোড়া খানা খাকে যানা’—এই সব। ওরা স্মেল করছে, ওরা ধরতে পারছে যে ক্র্যাকডাউন হবে। খবরটা তো তাদের কাছেও আছে। ওখানেই আমাদের শেষ করে দেওয়ার একটা ইচ্ছা তাদের ছিল। ২৩ মার্চে যারা পতাকা ওড়ায়নি, যারা আনুগত্য প্রকাশ করার একটা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং বিশেষ করে চার খলিফার দুই খলিফাকে যখন তারা নিয়ে গিয়েছিল, তাদের একটা নীলনকশা ছিল ওখানে একটা অঘটন ঘটানোর। আল্লাহ হায়াত রেখেছেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য আল্লাহ আমাদের জন্য রেখেছেন। আমরা বেরিয়ে চলে এলাম এবং পরবর্তীকালে কী নৃশংসভাবে শিশু-নারীসহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সলিমুল্লাহ সাহেব শহীদ হয়েছেন এবং তাঁর বাসায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁর দৌহিত্রও মারা গেছেন।
নূরে আলম সিদ্দিকী, স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতা ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি