হোম > ছাপা সংস্করণ

স্মার্ট তস্করমুক্ত সমাজভাবনা

ড. মো. ফখরুল ইসলাম

পেশির জোরে চোরের কণ্ঠ সব জায়গায় হয়ে ওঠে সরব। 
স্মার্ট চোর-জালিয়াতেরা অর্থ আত্মসাৎ করে ধনী সেজে অমানুষ, এরপর মাফিয়া হয়ে ওঠেন। সবশেষে হয়ে যায় নির্যাতনকারী ও নিপীড়ক।

সম্প্রতি দুটি বড় আত্মসাতের ঘটনা গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। একটি ১৫৮ কোটি টাকা, অন্যটি ৫৮২ কোটি টাকার সার আত্মসাতের সংবাদ নিশ্চয়ই অনেকের নজর কেড়েছে। এই বড় সংবাদ দুটি দেশের ব্যবসায়ীদের ভাবিয়ে তুলেছে, সঙ্গে দেশের মিউচুয়াল ফান্ডে অনেক বিনিয়োগকারীকেও।

এ ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, শুধু ব্যাংক নয়, শেয়ারবাজারের টাকাও আত্মসাৎ করা হয় এবং মিউচুয়াল ফান্ডের টাকাও কারসাজির মাধ্যমে উধাও হয়ে যেতে পারে। চারটি মিউচুয়াল ফান্ডে জমা থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের ১৫৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন উক্ত ফান্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রধান ব্যক্তি। তিনি গত চার বছর ধরে কৌশলে ওই টাকা সরিয়ে ফেলেন। ২০১৮ সাল থেকে একটু একটু করে তহবিল সরানোর ঘটনা ঘটায় এসব তহবিল দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা কাস্টডিয়ান প্রতিষ্ঠান এত দিন টের পায়নি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি নজরে আনা হলে তাদের টনক নড়ে।

মিউচুয়াল ফান্ডে অর্থ জমা করা নিরাপদ তহবিল হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু এসব ঘটনায় মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আগে কিছুটা কমে গেলেও আবার নতুন করে একবারে তলানিতে ঠেকে গেছে বলে অনেকে মনে করছেন।

আরেকটি বড় ঘটনা হলো, সরকারিভাবে আমদানি করা ৭২ হাজার টন রাসায়নিক সার বন্দর থেকে খালাসের পর গুদামে পৌঁছে না দিয়ে আত্মসাৎ করেছে পরিবহনের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর জন্য সরকারের ৫৮২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কারণ, বিসিআইসি একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২২-এর তথ্যানুযায়ী সর্বশেষ সাত বছরে প্রতিষ্ঠানটি ৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকার বেশি লোকসান দিয়েছে। এসব সার পরিবহনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের মালিক মূলত দেশের সার ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। পত্রিকায় আরও বিশদভাবে অনেক তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

এই লেখার মূল উদ্দেশ্য শুধু এ দুটি আত্মসাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়, দেশে এখন একটি নতুন স্লোগানের মাধ্যমে উন্নয়নের গতিকে বেগবান করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সেটা হলো, আগামীর বাংলাদেশ হবে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’। সেখানে এ ধরনের অর্থ কেলেঙ্কারির সংবাদ খুব সাংঘর্ষিক। এগুলো সব শ্রেণির মানুষকে আঘাত না করলেও খেটে খাওয়া সাধারণ কর্মজীবী মানুষকে বেশি পীড়া দেয়। এগুলোর সঙ্গে দেশের সব মানুষের আর্থিক বঞ্চনার বিষয়টি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ফুটে ওঠে।

দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় অনেক বেড়েছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আর্থিক তথা আয়বৈষম্য কতটুকু, তা বেশি বলা হয় না। কখনো সরকারিভাবে সেটা প্রকাশ করা হয় না। সরকারি দায়িত্বে থাকা মানুষ সরকারি তহবিল তদারক করে থাকেন। তাই সেটা সংগ্রহ ও ব্যবহার করার সুযোগ পান। অর্থাৎ, সরকারি দায়িত্ববানেরাই সরকারি সম্পদের রক্ষাকর্তা। তাঁরা জালিয়াত ও অর্থ-সম্পদ আত্মসাতে নিয়োজিত হয়ে পড়লে স্মার্টনেসের সংজ্ঞাকে নেতিবাচক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে হয়।

বাংলা একাডেমির অভিধানে বর্ণিত (২০২৩) অনলাইনে প্রদর্শিত ‘স্মার্ট’ শব্দের বাংলা অর্থ থেকে জানা যায় এর নানা দিক। অনেক ইংরেজি শব্দের বাংলায় বহুল ব্যবহারের মতো আমরা বাংলা ভাষায় স্মার্ট শব্দটিকে নানা জায়গায় নানা কারণে হুবহু ইংরেজিতে ‘স্মার্ট’ বাংলা শব্দের পাশে কথায় বলি, লিখি। বাংলা একাডেমির অভিধানের পুরোনো সংস্করণে স্মার্টের ৩১টি বাংলা শব্দ খুঁজে পেয়েছি। সবগুলোকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ভাগে ভাগ করে ব্যবহারও করা হয়েছে। আর সে জন্যই বোধ হয় মানুষ কতভাবেই না তার স্মার্টগিরি ফলাতে চায়। ইতিবাচকভাবে স্মার্ট শব্দটির ব্যবহার আমরা ভালোবাসি। বাংলা অভিধানের প্রথম দিকে স্মার্ট অর্থ কেতাদুরস্ত, বাবু, সেজেগুঁজে ফিটফাট হওয়া ইত্যাদি বলা হয়েছে। কিন্তু যিনি পদ-পদবি ও পোশাকে কেতাদুরস্ত ও ফিটফাট হয়ে ‘হোয়াইট-কলার ক্রাইম করেন’, অর্থাৎ আত্মসাৎ করেন, তাঁকে কি আমরা স্মার্ট বলব, নাকি আনস্মার্ট, নাকি মহাস্মার্ট বা সুপারস্মার্ট বলব? কিছুদিন আগে এক চোর চুরি করতে গিয়ে দোকানের মধ্যে আটকা পড়ে ৯৯৯ হটলাইনে পুলিশকে কল দিয়েছিল। সে দ্রুত উদ্ধারও পেয়েছে! তাহলে অভিধান অনুযায়ী নেতিবাচক কিছু বোঝালে বা ঘটানো হলে সেই ‘স্মার্ট’ বিষয়ে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে কীভাবে?

কেতাদুরস্ত স্মার্ট আত্মসাৎকারীর শাস্তি সংজ্ঞায় থাকলে সেটা বাস্তবে রূপ দিতে হবে। কারণ, স্মার্ট বললে শুধু গুণ বোঝায় না। পাশাপাশি শাস্তিকেও বোঝায়। এই গুণ বা শাস্তি মানুষ নামক স্মার্ট, আনস্মার্ট, মহাস্মার্ট বা সুপারস্মার্ট প্রাণী ও তাদের সমাজের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। যেমন—মেক্সিকোর সুপারস্মার্ট মাদক কারবারি জোয়াকিন এলচাপো এখন আমেরিকার জেলে বন্দী রয়েছেন। ৬ জানুয়ারি তাঁর ছেলে ওভিদিও গুজম্যানকে মেক্সিকোর সিনোলিয়া রাজ্যের রাজধানী কুলিয়াকান শহরে গ্রেপ্তারের পর সেখানে তাঁর সমর্থনপুষ্ট মাদক কারবারি চক্রের হামলা ও তাণ্ডবে ১০ জন সৈন্যসহ মোট ২৯ জন নিহত হয়েছেন। গাড়ি, বাড়ি, দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শতাধিক। এত বড় স্মার্ট মাদকসম্রাট তাঁর অনৈতিক মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে অতিস্মার্ট আধুনিক অস্ত্রসংবলিত অপরাধ চক্র গড়ে তুলেছেন। তিনি নিজে জেলে থাকলেও তাঁর অপরাধী ছেলে বাবার বেআইনি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে ফিটফাট কেতাদুরস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, যার পাল্টা আক্রমণে মেক্সিকোতে এতগুলো জানমালের ধ্বংস সাধন হলো।

এ রকম অনেক কেতাদুরস্ত ‘স্মার্ট’ আত্মসাৎকারী দেশের অনেক ক্ষতি করে চলেছেন। গত বছর পি কে হালদার সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা পাচার করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। হল-মার্ক দেশের সোনালী ব্যাংক থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। ডেসটিনি চারাগাছ বিক্রির নামে নিরীহ সৎ মানুষের সঞ্চয়-সম্পদ ধুয়ে-খুবলে খেয়ে সটকে পড়েছে। এরাই তো বড় বড় স্মার্ট-সুপারস্মার্ট চোর-ডাকাত, জালিয়াত। এসব অর্থ আত্মসাৎকারীর আদতে কোনো শাস্তি হয়নি।

স্মার্ট ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, পুলিশ, বিচারক ইত্যাদি গড়ে তোলার আগে স্মার্ট মানুষ গড়ার পরিকল্পনা থাকা উচিত। কারণ, আমরা দেখেছি, দুর্নীতিবাজেরা শুদ্ধি অভিযানের সময় স্মার্ট চালাকি করে নিজেকে রক্ষা করে। কর ফাঁকি দেওয়ার নানা স্মার্ট কৌশল অবলম্বন করে কোটি কোটি টাকার মালিকেরা। চাকরিতে নিয়োগের বেলায় দুর্নীতি ও তোয়াজ-তোষণের নীতিতে পর্যুদস্ত হয়ে পেছনে পড়ে যান মেধাবীরা। পেশির জোরে চোরের কণ্ঠ সব জায়গায় হয়ে ওঠে সরব। স্মার্ট চোর-জালিয়াতেরা অর্থ আত্মসাৎ করে ধনী সেজে অমানুষ, এরপর মাফিয়া হয়ে ওঠেন। সবশেষে হয়ে যান নির্যাতনকারী ও নিপীড়ক।

এদের আশ্রয়দাতারা আরও বেশি স্মার্ট হয়ে ওঠেন। এদের আমরা স্মার্ট বলি কীভাবে? স্মার্টের অর্থ শুধু ছিমছাম-ফিটফাট ভাবলে ভুল হবে। তাই তো স্মার্ট-সুপারস্মার্ট নয়, আমরা স্বাভাবিক, সৎ, কর্মঠ মানুষ চাই। কেতাদুরস্ত অতি স্মার্ট চোরদের জন্য অন্যায়ের স্মার্ট বিচার ও স্মার্ট শাস্তি দেওয়া জরুরি! সেটা করা না হলে এদের দেখে সমাজের পিছিয়ে পড়া আনস্মার্ট মানুষ হঠাৎ স্মার্ট সেজে ব্যাপক চুরি-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতে মেতে উঠলে, সেই ব্যাপক সামাজিক ভাঙন রোধ করবে কে?

লেখক: ড. মো. ফখরুল ইসলাম, অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

রোজা রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে কি?

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমালোচনা জাতিসংঘের উদ্বেগ

ভারতের হামলা, পাকিস্তানের প্রস্তুতি

মহাসড়কে ডাকাতি, লক্ষ্য প্রবাসীরা

বিআরটি লেনে বেসরকারি বাস