২৩-এ পা দিয়েছেন অনন্যা। একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে ধানমন্ডিতে দেখা। তিনি এসেছিলেন আড্ডা দিতে, মেয়েদের সাইকেল চালানো শেখানো হয় সেখানে। শুনে বেশ ভালো লাগল অনন্যার। ছোটবেলা থেকে পুষে রাখা মনের ইচ্ছে উঁকি দিল। গিয়ে দেখলেন, এক মা-মেয়ে একসঙ্গে সাইকেল চালাচ্ছেন। এত ভালো লাগল! সিদ্ধান্ত নিলেন তিনিও শিখবেন।
এবার চিন্তা শুরু, কীভাবে কী করবেন। বাসায় তো বলা যাবে না। মা জানলে বাবাকে বলে দেবেন আর বাবা হাড্ডি গুঁড়া করে দেবেন। এরপর একটা নতুন টিউশনি আর কাজের কথা বলে সে সময়টায় চলে যেতেন সাইকেল চালানো শিখতে, শুক্রবার একটা দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। এক মাসের ব্যাপার, মাসে চার শুক্রবার গেলেই হবে।
প্রথম দিন প্যাডেলিং করা না শিখলেও অনেক নতুন বিষয় জানা গেল, মেয়েদের সাইকেল চালানোর ব্যাপারে শারীরিক যেসব সমস্যার কথা তিনি শুনে এসেছেন, দেখা গেল সেসব পুরোপুরি সত্য নয়, কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা বা বানানো। তবে সাইকেল নিজের অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী হলে আর গিয়ার থাকলে, কোনো সমস্যাই নেই।
দ্বিতীয় সপ্তাহে অনন্যা প্রথম প্যাডেলে রাখলেন পা, এ যেন এক প্রাপ্তি, আনন্দে খুশিতে তিনি সেই আপুকে জড়িয়ে ধরলেন। অনেক ছেলে হাসে, সাইক্লিং আবার একটা শেখার জিনিস নাকি! আর ‘মেয়ে মানুষ’-এর সাইক্লিং শিখে হবেটা কী?
এরপর খুব সাহসী একটা কাজ করে ফেললেন অনন্যা। নিজের চাকরির টাকায় তিনি একটা সাইকেল কিনে ফেললেন। বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর মা বিস্মিত ও আতঙ্কিত। ‘সাইকেল চালিয়ে তুই অফিসে যাবি? এটা সম্ভব না।’
সারা জীবনে অনন্যা কখনো তাঁর বাবার মাথা নত হয় বা সমাজে লজ্জা পেতে হয়, এমন কিছুই করেননি; বরং সব ক্ষেত্রেই বাবার সিদ্ধান্ত আর জেদ মাথা পেতে মেনে নিয়েছেন। তবে এবার তিনি নিজে জেদ করেছেন, প্রথমবার।
রাতে মা গিয়ে বাবাকে বললেন, ‘দেখেছ, মেয়ে সাইকেল কিনেছে, এরপর কাদের কাদের সঙ্গে ঘুরতে চলে যাবে, অ্যাকসিডেন্ট হবে, আর মানুষ কী বলবে! এই বয়সী একটা মেয়ে সাইকেল চালাচ্ছে!’
খালার শ্বশুরবাড়ি কাছেই, তারা শুনে আড়ালে হাসা শুরু করল। ছোট খালা তাঁর মাকে এটা-সেটা বললেন। মা তখন বললেন, ‘তুই স্কুটি চালা, সাইকেল চালালে মানুষ আমাদের কী বলবে।’ অথচ স্কুটি কেনার সামর্থ্য তাঁদের নেই।
রাস্তায় বেরোলেই রোজ রিকশাওয়ালারা বলত, ‘সাইডে চাপেন, পারে না কিছু, মাইয়া মানুষ রাস্তায় বাইর হইসে সাইকেল নিয়া!’ সেই সঙ্গে একধরনের পৈশাচিক হাসি।
ছেলেরা টিজ করত, ‘দেখ দেখ, মেয়ে সাইক্লিস্ট, আমিও পারি, আমাকেও নাও।’
কেউ কেউ অবাকও হতো, ‘এই ভিড়ের রাস্তায় একটা মেয়ে, সাহস আছে বটে!’
মুরব্বি বা হুজুরগোছের অনেকে দেখে একদম কানের পাশেই শুনিয়ে বলেছে, ‘এডা মাইয়া না ব্যাডা, ছি ছি, কেয়ামতের আলামত, আস্তাগফিরুল্লাহ!’
কখনো বাইকার, বাস ড্রাইভার বা রিকশাওয়ালা ইচ্ছে করে তাঁদের বাহন সাইকেলের দিকে চাপিয়ে দিয়ে ফেলে দিতে চাইতেন।
তবে এত্ত এত্ত খারাপ লাগার মাঝে কিছু ভালো লাগাও আছে, যা সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়, যে মানুষগুলো অনুপ্রেরণা হয়ে থেকে যায় সারা জীবন।
এই যুগেও বাংলাদেশের রাজধানীতে মেয়েরা সাইকেল চালান দেখে এত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কতজন মিলে। অনন্যা বাবার মার খেয়েও তাঁর ইচ্ছেকে বিসর্জন দেননি, তিনি এগিয়ে গেছেন।
সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছালে তখন সাইকেল বা মোটরসাইকেল, কোনো কিছুতেই কারও সমস্যা থাকে না। সেই শীর্ষে পৌঁছানোর জন্যই এখন অনন্যার চেষ্টা।