হোম > পরিবেশ

নেপাল-তিব্বতের বন্যায় প্রভাব ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের, গবেষকদের দাবি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

কাদাধসে ভেসে গিয়েছে নেপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ছবি: কাঠমান্ডু পোস্ট

নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তে হিমবাহ ধসে যে প্রাণঘাতী বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল, তার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনেরও ভূমিকা ছিল বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকেরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, হিমবাহের ক্ষয়, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া এবং ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা মিলেই ভয়াবহ এই দুর্যোগের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

গবেষণাটির সহলেখক ও লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিদ ড. ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এই দুর্যোগের পটভূমি তৈরি করে দিয়েছে। এ বিষয়ে ‘একেবারেই সন্দেহ নেই’।

‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’ (ডব্লিউডব্লিউএ) গবেষণাটি করেছে। এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন দুর্যোগটির একমাত্র কারণ ছিল না। তবে এটি আগে থেকেই থাকা ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতাকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ওই এলাকায় চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এই অতিরিক্ত উষ্ণতা হিমবাহ ও পারমাফ্রস্টের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এ ছাড়া ওই অঞ্চলের হিমবাহগুলোও প্রতিবছর প্রায় আধা মিটার করে পাতলা হচ্ছিল। এতে হিমবাহের পুরোনো ফাটলগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে।

গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে ভারী তুষারপাতের পর এ বছরের শুরুর দিকে ওই এলাকায় জমে থাকা বরফ ও তুষার গলতে শুরু করে। গবেষকদের মতে, এসব প্রক্রিয়া একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে দুর্যোগের মাত্রা বাড়িয়ে থাকতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, এই প্রাণঘাতী দুর্যোগের পেছনে শুধু জলবায়ুগত কারণই নয়, ভূতাত্ত্বিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে নেপালে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ওই এলাকার শিলাস্তরকে দুর্বল করে থাকতে পারে। ওই ভূমিকম্পের সময়ও শিলা ও বরফের ধস নেমেছিল।

গবেষণার আরেক সহ-লেখক এবং উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বত জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ওয়াল্টার ইমারজেল বলেন, ওই এলাকা ভূতাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর ঢালটি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে হিমবাহ ও পারমাফ্রস্টের পরিবর্তনের কারণে সেটি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

গবেষকদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছাকাছি হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। এর আঘাত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)-এর ভূকম্পন পর্যবেক্ষণে তা ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড হয়। তবে এটি কোনো ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহ ধসের ঘটনা ছিল না; বরং হিমবাহ ধসের আঘাত থেকেই ওই ভূকম্পনধর্মী সংকেত তৈরি হয়েছিল।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. মাইক সার্ল আগে বিবিসিকে বলেছিলেন, হিমালয়ের অন্যান্য অংশের মতো লাংটাং লিরুং এলাকাতেও পাহাড়ের হিমবাহগুলো ক্রমে আরও খাড়া হয়ে উঠছে এবং কিছু অংশ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তবে একই সঙ্গে এত বড় একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুক বলেন, কোনো একটি ঘটনাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে বলা কঠিন। তবে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন উচ্চ পার্বত্য পরিবেশকে ধীরে ধীরে অস্থিতিশীল করে তোলে।

গবেষকদের মতে, এই দুর্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়ে হিমবাহ, পারমাফ্রস্ট ও পাহাড়ি ঢালের পরিবর্তন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। তাই এমন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় পাহাড়ি পরিবেশের পরিবর্তন আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে প্রবল বন্যা ও ভূমিধস আঘাত হানে। এতে বহু ঘরবাড়ি ভেসে যায়, ধ্বংস হয় সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো। নিহত বা নিখোঁজ হন হাজারো মানুষ।

এ দিকে নেপাল সরকার বন্যা ও ভূমিধসে নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা সংশোধন করে ৬ হাজার ১৫০ জন করেছে। এর আগে নিখোঁজের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ১৭৯। বুধবারের তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ১ হাজার ৪০৩।

দুর্যোগের পর নেপালি কর্তৃপক্ষ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে নেপালের অবদান খুবই কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি নেপাল।