হেমন্ত প্রায় শেষের পথে। বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা শোনা যাচ্ছে। সাধারণত শীত এলে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। আর অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে বাতাস।
আজ সকালে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে আছে ঢাকা। সংস্থাটির সকাল ৭টা থেকে ৮টা সময়সীমার রেকর্ডে দেখা যায়, ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স স্কোর ১৬৮।
রিয়েল-টাইম একিউআই স্টেশন র্যাংকিংয়ে দেখা যায়, ঢাকার কিছু জায়গায় দূষণের মাত্রা সংবেদনশীল মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় আছে। এর মধ্যে পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ি এলাকার বাতাস সবচেয়ে দূষিত অবস্থায় আছে। এলাকাটির আইকিউএয়ার স্কোর ১৭৯, যা সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর বাতাসের নির্দেশক।
র্যাংকিং তালিকায় আরও যেসব এলাকা রয়েছে—গুলশান লেক পার্ক, উত্তর বাড্ডা, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), বারিধারার পার্ক রোড, পল্লবী দক্ষিণ, গুলশানের বেজ এজওয়াটার আউটডোর, গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, গুলশান-২-এর রব ভবন ও গোড়ান।
ঢাকার নিম্নমানের বাতাসের প্রধান কারণ হলো পিএম ২.৫ বা সূক্ষ্ম কণা। এই অতিক্ষুদ্র কণাগুলো, যাদের ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের চেয়েও কম, ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। এর ফলে হাঁপানি (অ্যাজমা) বৃদ্ধি, ব্রঙ্কাইটিস এবং হৃদ্রোগের মতো শ্বাসযন্ত্র ও হৃদ্যন্ত্রের গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
শীতকালীন আবহাওয়ার ধরন, যানবাহন ও শিল্প থেকে অনিয়ন্ত্রিত নির্গমন, চলমান নির্মাণকাজ থেকে সৃষ্ট ধুলো এবং আশপাশের ইটভাটাগুলো এই দূষণ সংকটের জন্য দায়ী।
আইকিউএয়ারের তালিকায় শীর্ষ পাঁচে থাকা বিশ্বের অন্য শহরগুলো হলো মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর (২১৫, খুব অস্বাস্থ্যকর), পাকিস্তানের লাহোর (২০৬, খুব অস্বাস্থ্যকর), ভারতের দিল্লি (১৮২, সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর), ভারতের মুম্বাই (১৭৯, সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর), ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গো (১৭৮, সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর)।
বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমান সূচক ৫০-এর নিচে থাকলে বিশুদ্ধ বাতাস ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ হলে তা সহনীয়। ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে হলে সতর্কতামূলক বা সংবেদনশীল মানুষের (শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি) জন্য অস্বাস্থ্যকর। ১৫১ থেকে ২০০ হলে সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর এবং সূচক ২০১ থেকে ৩০০ হলে বাতাসকে খুব অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। আর সূচক ৩০০ ছাড়ালে সেই বাতাস দুর্যোগপূর্ণ।
বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় প্রতিবছর বহু মানুষ মারা যায়। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বায়ুদূষণ প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ৫২ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ বলে ২০২৩ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে (বিএমজে) প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় তুলে ধরা হয়।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গৃহস্থালি ও পারিপার্শ্বিক বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাবে বছরে ৬৭ লাখ মানুষ মারা যায়।
দীর্ঘদিন ঢাকার বাতাস অতিমাত্রায় দূষিত হওয়ায় বাইরে বের হলে সবাইকে মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া সংবেদনশীল ব্যক্তিদের অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার অনুরোধও করা হয়েছে।
পাশাপাশি ইটভাটা, শিল্পকারখানার মালিক এবং সাধারণ মানুষকে কঠিন বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ রাখা, নির্মাণস্থলে ছাউনি ও বেষ্টনী স্থাপন করা, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা, নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের সময় ট্রাক বা লরি ঢেকে নেওয়া, নির্মাণস্থলের আশপাশে দিনে অন্তত দুবার পানি ছিটানো এবং পুরোনো ও ধোঁয়া তৈরি করা যানবাহন রাস্তায় বের না করতে বলা হয়েছে।
অত্যন্ত সংবেদনশীল গোষ্ঠী: শিশু, বয়স্ক, হৃদ্রোগ বা শ্বাসকষ্টের রোগীরা সব ধরনের ঘরের বাইরে না যাওয়াই ভালো।
সাধারণ সুস্থ ব্যক্তি: তাদের উচিত বাইরে কাটানো সময় সীমিত করা এবং শারীরিক পরিশ্রমের কাজ এড়িয়ে চলা।
যদি বাইরে বের হতে হয়, তবে অবশ্যই দূষণ রোধে কার্যকর মাস্ক ব্যবহার করুন।
ঘরের ভেতরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করুন এবং দূষিত বাতাস প্রবেশ ঠেকাতে জানালা ও দরজা বন্ধ রাখুন।