হোম > পরিবেশ

গোপন মেমো: প্লাস্টিক উৎপাদনে নিয়ন্ত্রণ শিথিলের পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশের জন্য কতটা উদ্বেগের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে সামরিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: স্ক্রিনশট

প্লাস্টিক উৎপাদনে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক দূষণ রোধে তৈরি হতে যাওয়া ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক চুক্তি কার্যত অকার্যকর করে দিতে এরই মধ্যে ওয়াশিংটনের তৎপরতা শুরু হয়েছে। এই চুক্তিতে বড় ধরনের শিথিলতা ও আইনি ‘লুপহোল’ বা ফাঁকফোকরের সুযোগ তৈরি করতে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত ফাঁস হওয়া এক গোপন মেমোর তথ্যানুসারে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত তুলে প্লাস্টিক উৎপাদন কমানোর বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যেতে চায় ওয়াশিংটন।

বিশ্বজুড়ে বছরে ৫ কোটি ৭০ লাখ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে যখন বাংলাদেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকার মতো প্লাস্টিক-দূষণে বিপর্যস্ত দেশগুলো একটি কঠোর চুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রশাসনের এই অবস্থান চূড়ান্ত রূপ নিল।

পরিবেশবিদ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিতে প্লাস্টিক উৎপাদনে বৈশ্বিক সীমা নির্ধারণ করা না গেলে তার খেসারত দিতে হবে বাংলাদেশসহ গ্লোবাল সাউথের (তৃতীয় বিশ্ব) নদীমাতৃক ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে।

বাংলাদেশের জন্য কেন উদ্বেগের?

প্লাস্টিক দূষণের কারণে নদীমাতৃক বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবেশ, নালা-নর্দমা এবং কৃষিজমি ইতিমধ্যেই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে অবরুদ্ধ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শহরগুলোতে প্রায়শই তীব্র কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরে জমা হওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি করছে।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং আইইউসিএন-এর প্লাস্টিক টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যালেক্সান্দ্রা হারিংটন উল্লেখ করেন, বাণিজ্য ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ না থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর পক্ষে অভ্যন্তরীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দিয়ে এই পরিস্থিতির সামাল দেওয়া অসম্ভব। চুক্তির খসড়া দুর্বল হয়ে পড়লে কেবল প্লাস্টিক উৎপাদকারী পেট্রোকেমিক্যাল ধনী দেশগুলো সুবিধা পাবে, আর বর্জ্যের বোঝায় জর্জরিত হতে থাকবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো।

চলতি গ্রীষ্মে বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে পাঠানো মার্কিন মেমোতে দাবি করা হয়েছে, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি যেন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা সৃষ্টি না করে। মেমোতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্লাস্টিক বা সংশ্লিষ্ট রাসায়নিকের ব্যবহার সীমিত করা হলে মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সুরক্ষাসামগ্রীর কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ফাঁস হওয়া নথির ব্যাপারে সরাসরি মন্তব্য না করলেও জানিয়েছে, তারা এমন চুক্তি চায় যা সব দেশ মেনে চলতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করেছে যে মার্কিন অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি কিংবা গ্রাহকের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলে এমন বাধ্যতামূলক বিধিবিধান তারা মেনে নেবে না।

পরিবেশ সংগঠন ‘এনভায়রনমেন্টাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (ইআইএ) বিশেষজ্ঞ ইয়ংম্যানের মতে, বাইডেন প্রশাসনের নীতিগত নমনীয়তা বাদ দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখন প্লাস্টিক উৎপাদনে বৈশ্বিক সর্বোচ্চ সীমা বা বাধ্যবাধকতার শতভাগ বিরোধিতা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থেই জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন প্লাস্টিক প্রস্তুতকারকদের সংগঠন ‘আমেরিকান কেমিস্ট্রি কাউন্সিল’ (এসিসি)-এর পক্ষে বলা হয়েছে, উৎপাদনে আন্তর্জাতিক সীমা আরোপ করলে বিশ্বজুড়ে দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাবে, কিন্তু বর্জ্য সমস্যার সমাধান হবে না।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিরোধী দেশগুলোর চাপের মুখে চুক্তির মূল খসড়া তৈরির দায়িত্বে থাকা চেয়ার জুলিও কর্ডানো সম্প্রতি যে নতুন খসড়া প্রকাশ করেছেন, তাতে প্লাস্টিকের আন্তসীমান্ত বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিতকারী শক্ত শব্দ ‘shall’ (করতেই হবে)-এর জায়গায় আইনি ফাঁকফোকর সমৃদ্ধ ‘should’ (করা উচিত) যুক্ত করা হয়েছে।

প্লাস্টিক দূষণের চরম ভুক্তভোগী দেশগুলোর মতে, চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবী বা দুর্বল অঙ্গীকারের জায়গায় নেমে এলে এটি প্লাস্টিক সংকট কমানোর চেয়ে বরং ধনী দেশের প্লাস্টিক রপ্তানির সুযোগকেই বহাল রাখবে।

আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষভাগে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসছেন, যেখানে এই বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার পরিবেশগত সুরক্ষার স্বার্থ জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।