জনপ্রিয় তামিল অভিনেতা বিক্রমের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিপন্ন প্রজাতির গিবন নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে ভারতের তামিলনাড়ু বন বিভাগ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত ভিডিওতে অভিনেতাকে একটি লার গিবনকে জড়িয়ে ধরে এটির সঙ্গে খেলা করতে দেখা যায়। পরে ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, গিবনটি কীভাবে একটি ব্যক্তিগত বাড়িতে পৌঁছাল এবং এটি রাখার ক্ষেত্রে আইনগত নিয়ম মানা হয়েছিল কি না।
তবে এখন পর্যন্ত তদন্তকারীরা গিবনটি পাচার করা হয়েছিল, বিক্রমের মালিকানাধীন ছিল কিংবা অভিনেতা নিজে সেটিকে ভারতে এনেছেন—এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। বিক্রমও এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তাঁর জনসংযোগ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিনেতা কোনো বক্তব্য দিলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
তামিলনাড়ুর প্রধান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তা রাকেশ কুমার ডোগরা বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমতি ও নথিপত্র থাকলে ব্যক্তিগতভাবে লার গিবন রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে অভিনেতার সঙ্গে থাকা গিবনটির প্রকৃত উৎস এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরের সময় প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
লার গিবন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে বসবাসকারী ছোট আকারের বানরজাতীয় প্রাণী। থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে এদের দেখা যায়। আবাসস্থল ধ্বংস, শিকার এবং অবৈধ পোষা প্রাণীর বাণিজ্যের কারণে প্রাণীটি আজ বিপন্ন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী কনভেনশন সিআইটিইএস-এর আওতাতেও লার গিবনের সুরক্ষার কথা উল্লেখ আছে।
এদিকে, প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের একটি সূত্র সামনে এসেছে। বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ২০২০ সালে মণিপুরের এক ব্যক্তি ভারতের সরকারি ‘পরিবেশ’ (PARIVESH) পোর্টালে ৮টি লার গিবনের (চারটি পুরুষ ও চারটি স্ত্রী) নিবন্ধন করেছিলেন। নথিতে প্রাণীগুলোর উৎপত্তিস্থল হিসেবে মালয়েশিয়ার নাম উল্লেখ ছিল।
চলতি বছরের ৫ জুন ওই আটটির মধ্যে একটি পুরুষ ও দুটি স্ত্রী গিবন মণিপুর থেকে তামিলনাড়ুর ইরোড জেলার পেরুন্দুরাইয়ের এক ব্যক্তির কাছে ‘দত্তক’ দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্থানান্তর করা হয়। তবে তামিলনাড়ুর প্রধান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে প্রাণীগুলো রাজ্যে আনা হয়েছিল কি না, তার প্রমাণ এখনো তদন্তকারীরা পাননি।
এরপর গত ৫ আগস্ট একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী গিবন পেরুন্দুরাই থেকে চেন্নাইয়ে বিক্রমের এক আত্মীয়ের বাড়িতে যায়। এখন বন কর্মকর্তারা প্রাণীগুলোর পুরো যাত্রাপথের নথিপত্র যাচাই করছেন।
ভারতের বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যুরোও তদন্তে যুক্ত হয়েছে। সংস্থাটি চেন্নাইয়ের কর্মকর্তাদের নথি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
মণিপুর সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে হওয়ায় উত্তর-পূর্ব ভারতকে বিদেশি বন্যপ্রাণী পাচারের একটি সম্ভাব্য রুট হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নজরে রাখা হচ্ছে। তবে বর্তমান ঘটনায় গিবনগুলো পাচার হয়ে ভারতে ঢুকেছিল—এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বিদেশি প্রাণী পাচার নিয়ে ভারতের উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। গত বছর ব্যাংকক থেকে আসা শত শত বিদেশি প্রাণী বিভিন্ন বিমানবন্দরে জব্দ করা হয়। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতেও চেন্নাইয়ে ব্যাংককফেরত এক যাত্রীর কাছ থেকে কচ্ছপ, ইগুয়ানা ও সাপসহ ৩১টি বিদেশি প্রাণী জব্দ করা হয়েছিল। ফলে বিক্রমের ভিডিও ঘিরে শুরু হওয়া তদন্তটি এখন শুধু একজন অভিনেতার কর্মকাণ্ড নয়, ভারতে বিপন্ন ও বিদেশি প্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও নতুন করে নজর কাড়ছে।