ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় সংগীতসফর শেষে গত মাসে দেশে ফিরেছেন নগর বাউল জেমস। আজ তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে গতকাল কথা হয় তাঁর সঙ্গে। গান, বিদেশ সফর, ব্যক্তিজীবনের নানা অনুভূতিসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে জেমসের সঙ্গে কথা বলেছেন এম এস রানা
জন্মদিন তো কখনো ঘটা করে পালন করিনি। ভক্তরা করে। সেটাই দেখি, উপভোগ করি।
খুবই ভালো। দু-একটা অপ্রীতিকর ঘটনা বাদ দিলে পুরো সফরটা দারুণ উপভোগ্য ছিল।
দেশে বেশ কয়েকটি কনসার্ট করার কথা রয়েছে। এরপর ডিসেম্বরে সৌদির রিয়াদে কনসার্ট রয়েছে।
আমি তো কোনো পার্থক্য দেখি না। এটা ভক্তরা বলতে পারবে। আমার কাছে কোনো পার্থক্য মনে হয় না। হ্যাঁ, শারীরিক পরিবর্তন এসেছে। চুল কমে গেছে।
আর্ট ফর্ম তো পরিবর্তনশীল। একসময় ফটোগ্রাফি বিরাট এক ব্যাপার ছিল। পরে একসময় অতিরিক্ত ফটোগ্রাফার হয়ে যায়। ঠিক তেমনি এখন অতিরিক্ত মিউজিক হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত যত মিউজিক হয়েছে, তাতে আগামী ২০ বছর কোনো মিউজিক না হলেও মানুষের গানের অভাব হবে না। এখন মিউজিক কিনতে হয় না। যে জিনিস মানুষ ফ্রি পায়, তার আকর্ষণ কমে আসে। আমাদের সময়ের যাঁরা মিউজিশিয়ান, তাঁরা অত্যন্ত ভাগ্যবান। এখন অনেক মেধাবী মিউজিশিয়ান আছে, আমাদের চেয়েও মেধাবী। কিন্তু সময়ের কারণে তারা সঠিক মূল্যায়ন পাচ্ছে না।
এখন নানা ধরনের টেকনোলজি এসেছে। অনেকের দাবি, পেশাদার শিল্পীদের ক্ষেত্রে এসব টেকনোলজি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এখনকার মিউজিশিয়ানরা ভীষণ মেধাবী। তারা প্যাশন থেকেই মিউজিক করছে। কিছু পাওয়ার আশা থেকে নয়। কিছু পাওয়ার আশায় এখন মিউজিক করে কোনো লাভ নেই। যারা লাইভে ভালো করবে, তারা হয়তো কিছুটা বেনিফিটেড হবে।
না, হতাশার কিছু নেই। এটা সময়ের প্রয়োজনে হবেই। সামনে যেটা আসবে, সেটা মেনে নিতেই হবে। এখন কী দেখছি আমরা? চারদিকে এআইয়ের প্রভাব। এআই দিয়ে অনেক কাজ করা যাচ্ছে। কোনো কিছু জানাও লাগছে না। গানের বেলায়ও তাই হয়েছে। ডিজিটালি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এখন পর্যন্ত একমাত্র সিনেমা কিছুটা হলেও সেভ আছে। এ ছাড়া আমাদের অনেক আর্ট ফর্ম হারিয়ে গেছে। কিছু আর্ট ফর্ম মানুষ ভালোবাসা থেকে ধরে রেখেছে।
আমি হয়তো করছি না। তবে কেউ ব্যবহার করতে পারলে শতভাগ ব্যবহার করা উচিত।
‘সোনালী বিকেল’ অ্যালবামে ‘তোমাকে বাঁশির মতো বাজাই’ শিরোনামের গানে আপনার সঙ্গে গেয়েছিলেন মিতালী মুখার্জি। এরপর আর কোনো দ্বৈত গানে আপনাকে না পাওয়ার কারণ কী?
তেমন কোনো কারণ নেই। আর করা হয়ে ওঠেনি।
অনেকেই আপনাদের গান কাভার করেন। কেউ কেউ ভালো করেন, আবার কারও বেলায় সুর-সংগীতের ব্যত্যয়ও ঘটে। অনেকেই বলেন, বিষয়টা নিয়ন্ত্রণে থাকা ভালো। আপনার মতামত কী?
গান বানানো হয়েছে কারণ মানুষ শুনবে, গাইবে; মাঠে ঘাটে যখন যার যেখানে ইচ্ছা, তার মতো করেই গাইবে। এসব কাজে বাধা দেওয়া ঠিক না। সংস্কৃতি হলো নদীর মতো, বইতে থাকবে। যে যা করছে করতে থাকুক।
অনেক দিন হলো নতুন গান প্রকাশ করছেন না। নতুন গান প্রকাশের কোনো পরিকল্পনা আছে?
পরিকল্পনা তো আছে। স্টেজ শো নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। এ কারণে সময় বের করতে পারছি না। তবে অবশ্যই নতুন গান করার ইচ্ছা আছে।
না, এখন আর লেখা হচ্ছে না। আবার শুরু করব ভাবছি।
আপনার অনেক গানে যেমন আনন্দ প্রকাশ পেয়েছে, অনেক গানে আবার দুঃখের প্রকাশ রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে আপনি কিসে আনন্দ পান আর কিসে দুঃখ?
সবকিছুতেই তো আনন্দ। এই যে জন্মদিন উপলক্ষে অনেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, এটাই আনন্দ। এখানে দুঃখের কিছু নেই। দুঃখকে কোনোভাবেই সামনে এগিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। দুঃখকে জীবন থেকে ইরেজ করে দিতে হবে।
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আমার কোনো হিসাব নেই। কী পেলাম আর কী পেলাম না, এসব নিয়ে কখনো ভাবি না।
আগে থেকে ভেবে কোনো কিছু তৈরি হয় না। গান তো সাধনার বিষয়। হিট অব দ্য মোমেন্টে যেটা আসে, তা তো পরিকল্পনা করে করা সম্ভব না।
এখন যে গানগুলো গাচ্ছি, সেগুলোই বেশি প্রিয়। যেমন শামসুর রহমানের লেখা ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেব’ গানটির কথা বলতে পারি। রাহমান সাহেবের সঙ্গে অন্য রকম সম্পর্ক ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি আমার জন্য আরও একটি গান লিখেছিলেন। তবে সেটি আর করা হয়নি।
আপনি তো ফটোগ্রাফিও করেন। এখন ফটোগ্রাফি বন্ধ আছে। প্রায় বছর দুয়েক হলো ছবি তোলা বন্ধ আছে।
কোনো দিকনির্দেশনা নেই। প্যাশন থেকে গান করে যেতে হবে। ফায়দা চিন্তা করলে গানবাজনা একেবারে স্টপ করে দাও। আর ফায়দা যদি এসে যায়, তাহলে এসে গেল। একে দেখে ওকে দেখে যদি গান করো, তাহলে হতাশ হতে হবে।
১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর সঙ্গে শেষ কবে দেখা বা কী কথা হয়েছিল?
শেষ দেখা হয়েছিল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। আর ফোনে শেষ যে কথা হয়েছিল, সেটা বলতে চাই না। তার সঙ্গে আমার অন্য রকম সম্পর্ক ছিল। সব সময় মিস করি। মাঝে মাঝে তার ওপর রাগও লাগে। চলে গেল কোনো কারণ ছাড়া।
জেমস ও আইয়ুব বাচ্চু বাংলাদেশের ব্যান্ডের জগতের তুমুল জনপ্রিয় দুই শিল্পী। ওই সময়টায় গান নিয়ে আপনাদের প্রতিযোগিতা হতো। কে কার চেয়ে ভালো গান উপহার দেবেন, কে কার চেয়ে ভালো স্টেজ পারফরম্যান্স করতে পারেন—ভালো করার এমন প্রতিযোগিতা কি এখন হয়?
এখনকার কথা বলতে পারব না। তবে তখন ভালো একটি কম্পিটিশন ছিল। সে সময় আমরা একজন আরেকজনের রেকর্ডিং স্টুডিওতেও যেতাম। দেখা যেত আমি রেকর্ডিং করছি, সেখানে আইয়ুব বাচ্চু হাজির, আবার তাঁর রেকর্ডিংয়ের সময় আমি চলে যেতাম। এখন তো স্টুডিও কালচারটাই নাই। শিল্পীদের মধ্যেও সেই কানেকশনটা এখন আছে কি না জানা নেই। এখন সবাই নিজের স্টুডিওতে কম্পিউটারের মধ্যে মিউজিক নিয়ে ডুবে থাকে। আগে তো স্টুডিওতে যেতে হতো। সবার সঙ্গে যোগাযোগ আর ঘনিষ্ঠতা বেশি ছিল।
না। একাকিত্ব অনুভব হয় না। তবে আমার সঙ্গে যারা ছিল, তাদের খুব মিস করি। যেমন এবির (আইয়ুব বাচ্চু) সঙ্গে কথা বলা শুরু করা মানেই ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়া। সে খুব আড্ডাবাজ মানুষ ছিল।
টেক ইট ইজি। জীবন নিয়ে জটিলভাবে ভাবার কোনো দরকার নেই, প্রতি মুহূর্তে বাঁচো, নিজের ভালোটা দেখো। সবাই নিজের ভালো করো। সবার ভালো হলে এমনিতেই দেশের ভালো হবে।