হোম > বিনোদন > সিনেমা

গান গাওয়া থেকে সংগীত পরিচালনা

বিনোদন ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

তত দিনে উত্তমকুমার বাংলা ইন্ডাস্ট্রির একচ্ছত্র নায়ক। যে সিনেমাই মুক্তি পাচ্ছে, ঢেউয়ের মতো দর্শকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে প্রেক্ষাগৃহে। সেই আবহে ১৯৫৬ সালে এল দেবকী বসু পরিচালিত ‘নবজন্ম’। এতে নতুন চমক নিয়ে এলেন মহানায়ক। সেই প্রথম দেখা গেল, সাতটি বৈষ্ণব পদাবলি নচিকেতা ঘোষের সুরে নিজেই গেয়েছেন উত্তম। গানগুলো ভালো সাড়া ফেলেছিল। তবে নবজন্মতে গান গাইলেও সিনেমার জন্য আর কখনো গান রেকর্ড করেননি তিনি। বরং দুটি সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছিলেন।

গানবাজনার প্রতি উত্তমকুমারের ভালোবাসার সৃষ্টি ছোটবেলায়। তাঁদের গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়িতে গানের আসর বসত। সেই আসরে থাকতেন তিনি। থিয়েটারে অভিনয় করতে করতেই ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীত শিখতে শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে উত্তমকুমার তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার আমি’তে লিখেছেন, ‘সিনেমায় আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা তখন প্রবল আমার। শুনেছিলাম গান জানলেই নাকি সহজেই সিনেমায় সুযোগ পাওয়া যায়।...আমি তাই গান শেখবার জন্য মরিয়া হয়ে গেলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম গান শিখবই। কিন্তু কে শেখাবে আমাকে? এই ভাবনায় আমি নিদারুণ ব্যাকুল হয়ে পড়েছি। হঠাৎ মনে পড়ল নিদানবাবুর কথা। কণ্ঠশিল্পী ও সংগীতশিক্ষক হিসেবে নিদানবাবুর তখন নামডাক অনেক।...বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে একদিন একেবারে সরাসরি হাজির হলাম তাঁর কাছে।’

নিজের এই সংগীতশিক্ষাকে উত্তমকুমার কাজে লাগিয়েছিলেন অভিনয়ে। তাই তিনি যখন ক্যামেরার সামনে গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলাতেন, মনেই হতো না অন্য কেউ গাইছেন। ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ থেকে উত্তমকুমার যখন হয়ে উঠলেন বাংলা সিনেমার সেরা আইকন, তখন থেকে গানের ব্যাপারে আলাদা করে ভাবতে শুরু করেন। গানের রেকর্ডিংয়ে উপস্থিত থাকতেন। মতামত দিতেন। গানের রিহার্সালেও হাজির থাকতেন নিয়মিত। সুর করার সময় নানা পরামর্শ দিতেন।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘কাল তুমি আলেয়া’ সিনেমায় সংগীত পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হন উত্তমকুমার। তিনটি গানের একটি ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায়, বাকি দুটি গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। গানগুলো জনপ্রিয় হওয়ার পরেও উত্তম কিন্তু চট করে অন্য সিনেমায় সুর দিতে যাননি। সেটা দিয়েছিলেন আরও ১১ বছর পর। ১৯৭৭ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘সব্যসাচী’ সিনেমায়।

সিনেমায় আর না গাইলেও উত্তমকুমার বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে গাইতেন। দুস্থ শিল্পীদের অর্থসাহায্যের জন্য করা অনুষ্ঠানেও গেয়েছেন। আরতি মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় গান ‘এই মোম জোছনায়’ উত্তমকুমারের জন্য করেছিলেন নচিকেতা ঘোষ। রবীন্দ্রসদনের এক অনুষ্ঠানে উত্তমকুমারই প্রথম গেয়েছিলেন। গানটি পছন্দ হওয়ায় এইচএমভি থেকে রেকর্ডও করেন।

উত্তমকুমারের মাত্রাজ্ঞান ছিল প্রখর। তাই পরিচালক হিসেবে ‘শুধু একটি বছর’, ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ও ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’—তিনটি সিনেমার সবই আলোচিত হলেও, তিনি নিয়মিত পরিচালনার দিকে ঝোঁকেননি। অন্যদিকে, সিনেমার গানে ও সংগীত পরিচালনায় সফল হওয়ার পরেও উত্তমকুমার সংগীত পরিচালনায় মন দেননি, বরং জোর দিয়েছেন অভিনয়ে। তাই গানের দৃশ্যে তাঁর মতো সুন্দর এবং যথাযথ দ্বিতীয় কোনো অভিনেতাকে ভাবা যায় না।