ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার। উৎসবে অংশ নিতে ৩ অক্টোবর টিমের সঙ্গে ভেনিসে পৌঁছান অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। ৬ সেপ্টেম্বর সিনেমার প্রিমিয়ারের পর ইতালির মেস্ট্রেতে ভাইয়ের বাসায় যান বাঁধন। সেখানে গত সোমবার ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে একটি পার্কে বেড়াতে যান। রাতে পার্ক থেকে ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাঁকে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে আঘাত করেন। ঘটনার ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেই রাতেই ফেসবুক লাইভে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন বাঁধন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আবার লাইভে এসে বাঁধন জানান, এই ঘটনায় ইতালিতে মামলা করছেন তিনি।
বাঁধন দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীদের কয়েকজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন। অভিনেত্রীর অভিযোগ, তাঁকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে বলা হয়। সেই দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার ও প্রকাশের চেষ্টা করেন হামলাকারীরা। সে সময় একদল প্রবাসী বাংলাদেশি বাঁধনের দিকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারেন। একপর্যায়ে তাঁরা বাঁধনকে আঘাত করেন। ফেলে দেওয়া হয় তাঁর মোবাইল ফোন।
হেনস্তাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে গতকাল দুপুরে ফেসবুক লাইভে বাঁধন বলেন, ‘আমি কখনো মাথা নত করিনি, সেটা করতেও ভুলে গিয়েছি। আমাকে ভেঙে ফেলা এত সহজ না। এখানকার পুলিশ অনেক সহায়তা করেছে। সেদিন রাতে আমাকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আমাকে ফোন করা হয়েছে। তারা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন। তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় থানায় মামলা করতে যাব। আমাদের কাছে সমস্ত প্রমাণ আছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে চিহ্নিত করেছি।’
বাঁধন আরও বলেন, ‘জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, যেটা আমার জীবনে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি। এবং আমি একজন গর্বিত জুলাই যোদ্ধা। সবাই আমাকে বলছে, বাঁধন আপনি সাহস হারাবেন না। বাঁধন সাহস হারানোর জন্য জন্মায় নাই। এ কথাটা মনে রাখা প্রয়োজন। আমাকে ভয় দেখানো, ভেঙে ফেলা এত সহজ না। শুধু আমার ভাই ও তাঁর পরিবার যেভাবে হ্যারাজ হয়েছে, সেটার জন্য মারাত্মকভাবে আপসেট।’
আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শোবিজের মানুষেরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁরা। চিত্রনায়িকা পরীমণি বলেন, ‘বেশি কিছু না। কতগুলা ...বাচ্চা রাস্তায় ঘেউ ঘেউ করছে। এদের কাছে মানুষের বাচ্চার কান্না কিছুই ম্যাটার করে না। করেও নাই।’
অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ লেখেন, ‘এই দেশে শিল্পী হওয়াটাও পাপের। কারণ শিল্পীরাই দেখি সবচেয়ে বড় রাজনীতিবিদ হিসেবে কথা বলছেন। কোনো শিল্পীর ওপরই হামলা কাম্য নয়। সেটা ৩২ নম্বরে হোক আর ভেনিসে।’
সাফা কবির লেখেন, ‘আমি ভীষণভাবে মর্মাহত, ক্ষুব্ধ এবং লজ্জিত। আজমেরী হক বাঁধন আপু ও তাঁর পরিবারকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো শিল্পীরই এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত নয়। একজন শিল্পী যখন দেশের বাইরে একটি চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের চলচ্চিত্র ও নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যান, তখন তাঁর প্রাপ্য হওয়া উচিত সম্মান ও নিরাপত্তা; অপমান, হয়রানি বা আতঙ্ক নয়। ...বাঁধন আপুর সঙ্গে যা ঘটেছে, তাতে আমি গভীরভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ। আমি চাই, এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক এবং তিনি ন্যায়বিচার পান।’
সংগীতশিল্পী হাসান লেখেন, ‘আজমেরী হক বাঁধন এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, একজন মানুষ হিসেবে এবং একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রতি এমন আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একজন শিল্পী যখন দেশের বাইরে যান, তখন তিনি শুধু নিজের জন্য যান না, কোনো না কোনোভাবে তিনি তাঁর দেশ, সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানে তাঁর প্রাপ্য হওয়া উচিত সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা। কিন্তু তার বদলে যদি তাঁকে অপমান, হয়রানি কিংবা আতঙ্কের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সেটা শুধু একজন শিল্পীর প্রতি অন্যায় নয়, আমাদের সবার জন্যই লজ্জা।’
প্রতিবাদ জানিয়ে আরও পোস্ট করেছেন নির্মাতা শঙ্খদাস গুপ্ত, শিহাব শাহীন, অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম, রুকাইয়া জাহান চমক, অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিমসহ অনেকেই।