সাক্ষাৎকার

যখনই ‘পদাতিক’ দেখি, বাবার কথা মনে পড়ে: চঞ্চল চৌধুরী

সৃজিত মুখার্জির ‘পদাতিক’ সিনেমায় চঞ্চল চৌধুরী অভিনয় করেছেন মৃণাল সেনের চরিত্রে। সিনেমার শুটিংয়ের আগেই বাবাকে হারান চঞ্চল। সেই শোক বুকে নিয়ে মৃণাল সেন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ক্যামেরার সামনে। দুই বছর আগে এই সিনেমা দিয়ে টালিউডে অভিষেক হয় চঞ্চলের। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর এবার পদাতিক আসছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি ফাইভে। সিনেমা ও অন্যান্য প্রসঙ্গে চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেছেন শিহাব আহমেদ

ওটিটিতে ‘পদাতিক’ মুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কবে মুক্তি পাচ্ছে?

আমি এখনো মুক্তির তারিখটা জানি না। বলা হয়েছে, খুব শিগগির ঘরে বসে জি ফাইভে পদাতিক দেখতে পারবেন দর্শক।

২০২৪ সালে একসঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশে মুক্তির কথা ছিল পদাতিক। আপনিও চাইছিলেন বাংলাদেশের দর্শক সিনেমাটি দেখুক, কিন্তু তা হয়নি। ওটিটিতে রিলিজের ফলে আপনার সেই ইচ্ছা পূরণ হচ্ছে। কেমন লাগছে?

কতটা দিন অপেক্ষায় ছিলাম! সৃজিত মুখার্জির সঙ্গে দেখা হলেই জিজ্ঞেস করতাম, সিনেমাটি তো আর বাংলাদেশে রিলিজ দেওয়া হলো না, কবে আমার দেশের মানুষ দেখার সুযোগ পাবেন? উনি বলতেন, ভালো প্ল্যাটফর্মে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ফাইনালি সিনেমাটি ওটিটিতে মুক্তির ঘোষণা এল। খুব ভালো লাগছে।

বাংলাদেশের হলে পদাতিক মুক্তি না পাওয়ায় কোনো আফসোস রয়েছে?

আফসোস বলব না, তবে খুব ইচ্ছা ছিল—দেশের হলে সিনেমাটি মুক্তি পাক। প্রযোজকও সেভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন। দুর্ভাগ্য যে একই সময়ে কলকাতায় আর জি কর আন্দোলন এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন চলছিল। এই দুই ঘটনায় সিনেমাটি বাংলাদেশে রিলিজ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য একটা কাজ পদাতিক। আমি মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয় করেছি। শুধু উপমহাদেশের নয়, বিশ্বে সেরা নির্মাতাদের একজন মৃণাল সেন। তাঁর জন্ম ফরিদপুরে। এ দেশেও অনেক দর্শক আছেন, যাঁরা মৃণাল সেনের কাজ দেখেন, উনার ভক্ত। তাঁরা সিনেমাটির জন্য অপেক্ষা করেছেন।

কলকাতায় কেমন সাড়া পেয়েছিল?

আর জি কর আন্দোলনের কারণে কলকাতায়ও বেশি দিন চালানো যায়নি সিনেমাটি। তখন মানুষের মনোযোগ ছিল আন্দোলনের দিকে। সব মিলিয়ে নির্মাতা-অভিনয়শিল্পীদের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই সিনেমাটি হল থেকে নেমে গেছে। ওটিটিতে মুক্তির ফলে যাঁরা হলে দেখতে পারেননি, তাঁরাও এবার দেখার সুযোগ পাবেন। তবে কলকাতায় ক্রিটিক লেভেলে প্রশংসিত হয়েছে পদাতিক। আমার দেশের দর্শকদেরও যদি ভালো লাগে, সেটা আমার জন্য আরও বড় প্রাপ্তি হবে।

পদাতিকের শুটিংয়ের অল্প কদিন আগে বাবাকে হারিয়েছেন। সেই শোক বুকে নিয়েই শুটিং করেছেন। এখন সিনেমাটি দেখে কী মনে হয়?

আমি যতবার পদাতিক দেখি, ততবার সেই সময়ের কথা মনে পড়ে। এই সিনেমা নিয়ে বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছি। আমার কাছেও একটা প্রিভিউ কপি আছে। সেটা দেখলেও বাবা হারানোর শোক নিয়ে কাজ করার মুহূর্তগুলো মনে পড়ে, বাবার কথা মনে পড়ে।

কেমন ছিল শুটিংয়ের দিনগুলো?

বাবার শেষকৃত্য করার দুই দিন পর শুটিংয়ে যোগ দিয়েছিলাম। আমার শুটিং ছিল ২২-২৩ দিন। কলকাতা, শান্তিনিকেতন, মুম্বাই, পুনে, ভেনিসে শুটিং করেছি। প্রতিটি মুহূর্ত কীভাবে কাটত, তা বলে বোঝানো কঠিন। শুটিং চলাকালে ক্যারেক্টারের মধ্যে থাকতাম, শুটিং শেষে যখন হোটেলে ফিরতাম, সারাক্ষণ বাবার কথা মনে পড়ত। প্রায় রাতেই রুমের মধ্যে একা চিৎকার করে কাঁদতাম। এই অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার মতো নয়। একজন শিল্পীকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ করতে হয়। সিনেমার পুরো টিম যেভাবে মানসিক সাপোর্ট দিয়েছে, সেটা কোনো দিন ভুলব না; বিশেষ করে সৃজিত মুখার্জি। দুই দিন শুটিংয়ের পর তাঁকে বললাম, আমি আর পারছি না। এই কদিনের শুটিংয়ে যে খরচ হয়েছে, তা আমি দিয়ে দিচ্ছি। আপনি শুটিং প্যাকআপ করেন। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছি। বাবার কথা মনে পড়লে আমি চরিত্রের মধ্যে থাকতে পারি না। তিনি বললেন, ‘আমি জানি, যখন শুটিং চলে, তখন তুমি চরিত্রের মধ্যে থাকার চেষ্টা করো। দিনরাত তোমার মাথায় চরিত্রটি ঘুরতে থাকে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর কারণে এখন তা পারছ না। তবু এটুকুই বলব, তুমি যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবে, ঠিক ততক্ষণ ক্যারেক্টারে থেকো। বাকি সময় বাবার কথা মনে করো, কান্না করো, শোক বহন করো। আমার বিশ্বাস, এটুকু তুমি পারবে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত শট ওকে না হবে, আমি শট নিতে থাকব। তুমি শুটিং নিয়ে চিন্তা করো না।’ বাবা হারানোর কষ্ট নিয়ে কাজটি শেষ করেছি। এরপর কষ্ট পেলাম সিনেমা মুক্তির সময়। বাংলাদেশে মুক্তি পেল না, আন্দোলনের কারণে কলকাতাতেও ঠিকমতো চলল না। কাঙ্ক্ষিত দর্শকের কাছে সিনেমাটি পৌঁছাল না। অবশেষে সেই জায়গা পূরণ হচ্ছে। এটাই আমার জন্য আনন্দের।

সম্প্রতি কলকাতায় আরও কয়েকটি কাজ করেছেন। সেগুলো নিয়ে বলুন।

দুটি সিনেমার কাজ শেষ করেছি। ব্রাত্য বসুর ‘শেকড়’ ও সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘আজাদি’। আশা করছি আগামী বছর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে। এ ছাড়া প্রতীম ডি গুপ্তর একটি সিরিজে অভিনয় করলাম। দুই বছর আগে সে ‘চালচিত্র’ নামের সিনেমা বানিয়েছিল। যেখানে আমাদের অপূর্ব অভিনয় করেছিল। এবার সেটির প্রিকুয়েল হিসেবে সিরিজ তৈরি হচ্ছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘চালচিত্র: এক চালা’। শিগগির ডাবিং করতে যাব কলকাতায়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে হইচইয়ে মুক্তি পাবে সিরিজটি।

আপনি কোন চরিত্রে অভিনয় করলেন?

আমার চরিত্রটি একজন সিরিয়াল কিলারের। সিনেমায় যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ব্রাত্য বসু। সিরিজের গল্প চরিত্রটির আগের সময়ের গল্প নিয়ে।

বাংলাদেশেও দুর্গাপূজায় আপনার অভিনীত ‘আন্ধার’ মুক্তি পাচ্ছে। সিনেমাটি নিয়ে বলুন।

হরর জনরায় আন্ধার বানিয়েছেন রায়হান রাফী। আমাদের দেশে হরর জনরার তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ নেই। ওটিটিতে কয়েকটা কনটেন্ট থাকলেও সিনেমায় নেই। তাই এটা আমাদের সবার জন্য চ্যালেঞ্জিং কাজ। অনেক সময় নিয়ে সিনেমাটি করা হয়েছে। শুটিংয়ের আগে রিহার্সাল ক্যাম্প করেছি। দেশের বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ হচ্ছে। এতে আরও অভিনয় করেছেন আফসানা মিমি, গাজী রাকায়েত, সিয়াম, তুষি, মোস্তফা মনওয়ারসহ অনেকে।

সিনেমার পোস্টার প্রকাশ পেল। শুনলাম, দুই দিন পোস্টার শুট করেছেন?

আগেও সিনেমার পোস্টার শুট করেছি। কিন্তু এইভাবে আয়োজন করে এবারই প্রথম শুট করলাম। স্টুডিও নাইন এন হাফের একটা ফ্লোর ভাড়া নিয়ে সেট বানিয়ে দুই দিন ফটোশুট হয়েছে। পোস্টার দেখার পর অনেকে ভেবেছে, এআই দিয়ে বানানো। কিন্তু এটা রিয়েল ফটোশুট। দর্শকের কাছে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে পোস্টার নিয়ে লিখছেন। সবার মধ্যে সিনেমাটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। প্রযোজকদের ধন্যবাদ, প্রচারের জন্য তাঁরা আলাদা বাজেট করেছেন। কারণ, সিনেমার প্রচারটা গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দিনের মধ্যে মুক্তির তারিখ ঘোষণা করা হবে। আমরা চাচ্ছি, সিনেমাটি ঘিরে উৎসবের আমেজ তৈরি হোক। আমি বিশ্বাস করি, আন্ধার সিনেমায় দর্শক নতুন ধরনের গল্পে নতুন নির্মাণের স্বাদ পাবে।