যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার একটি স্টেট পার্কে ২০২৪ সালের এপ্রিলে ৩০ বছর বয়সী মাইকা মিলারের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই তাঁর মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্নের জন্ম নেয়। ঘটনার ১০ দিন পর কর্তৃপক্ষ জানায়, মাইকা আত্মহত্যা করেছেন। রোবেসন কাউন্টি শেরিফের দপ্তর জানায়, নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ, সাক্ষাৎকার, ঘটনাস্থলের আলামত এবং নর্থ ক্যারোলিনা মেডিকেল এক্সামিনারের পরীক্ষার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে।
তবে সরকারি সিদ্ধান্তের পরও ঘটনাটি নিয়ে আগ্রহ কমেনি। মৃত্যুর আগে মাইকা তাঁর স্বামী দক্ষিণ ক্যারোলিনার পাদরি জন-পল ‘জেপি’ মিলারের কাছ থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। একই সময়ে তিনি পুলিশকে একাধিকবার জানিয়েছিলেন, তাঁকে অনুসরণ ও হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি নিজের গাড়িতে একটি ট্র্যাকিং ডিভাইস পাওয়ার পর তিনি পুলিশকে বলেছিলেন, ‘আমি আমার জীবনের ব্যাপারে ভয় পাচ্ছি।’
দুই বছরেরও বেশি সময় পর মাইকার জীবন ও মৃত্যুর কাহিনি নিয়ে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘ডেথ অব দ্য পাস্তরস ওয়াইফ’। অপ্রকাশিত ভিডিও, ব্যক্তিগত ডায়েরি, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের বক্তব্যের মাধ্যমে এতে মাইকার জীবন, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৯৪ সালে কানসাসের উইচিটায় জন্ম নেওয়া মাইকা ফ্রান্সিস ছিলেন ছয় ভাইবোনের একজন। পরে তাঁর পরিবার দক্ষিণ ক্যারোলিনার মার্টল বিচে চলে যায়। সেখানে তিনি সলিড রক চার্চের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন এবং চার্চের সংগীত ও উপাসনা দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি জন-পলের ব্যক্তিগত সহকারী এবং তাঁর পরিবারের শিশুদের দেখাশোনার কাজ করতেন। দুজনই তখন বিবাহিত থাকা অবস্থায় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তারা বিয়ে করেন। তখন মাইকার বয়স ছিল ২৩ এবং জন-পলের ৩৮।
কিন্তু বিয়ের পর তাদের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যায়।
২০২৩ সালের দিকে মাইকা স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। তথ্যচিত্রে তাঁর বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা জন-পলের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ এবং পরকীয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
মাইকা ২০২৩ সালের অক্টোবরে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। পরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। এরপর তিনি পুলিশকে একাধিকবার হয়রানি ও নজরদারির অভিযোগ জানান। নিজের গাড়িতে জিপিএস ট্র্যাকার, গাড়ির টায়ারে রেজর ব্লেড এবং এমন কিছু বার্তা পাওয়ার কথা জানান, যাতে তার মনে হয়েছিল জন-পল তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে জানতেন।
২০২৪ সালের মার্চে তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ চেয়েছিলেন। ১৫ এপ্রিল আবার বিচ্ছেদের আবেদন করেন। এর মাত্র ১২ দিন পর, ২৭ এপ্রিল, নর্থ ক্যারোলিনার লাম্বার রিভার স্টেট পার্কে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। পরে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সরকারি সিদ্ধান্তের পরও মাইকার পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের বক্তব্য এবং মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া কয়েকজন সরাসরি জন-পলের আচরণকে মাইকার মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তবে কর্তৃপক্ষের আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রয়েছে এবং মাইকার মৃত্যুর জন্য জন-পলের বিরুদ্ধে কোনো হত্যা মামলা হয়নি।
তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি জন-পলের বিরুদ্ধে সাইবার-স্টকিং এবং ফেডারেল তদন্তকারীদের কাছে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনে। প্রসিকিউটরদের দাবি, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে মাইকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়মিত হয়রানি করেছেন, আর্থিক ও দৈনন্দিন জীবনে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং গাড়িতে ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এক ঘটনায় এক দিনে মাইকাকে ৫০ বারের বেশি যোগাযোগ করার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া মাইকার অনুমতি ছাড়া তার একটি নগ্ন ছবি অনলাইনে প্রকাশ এবং গাড়ির টায়ার নষ্ট করার অভিযোগও আনা হয়েছে। জন-পল সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি ১ লাখ ডলারের বন্ডে মুক্ত আছেন। একাধিকবার পিছিয়ে যাওয়া তার ফেডারেল বিচার বর্তমানে অক্টোবরে হওয়ার কথা রয়েছে।
জুলিয়া উইলবি নাসন ও মাইকেল গ্যাসপারোর পরিচালনায় নির্মিত তিন পর্বের এই তথ্যচিত্রে মাইকার জীবনের বিভিন্ন সময়ের ভিডিও এবং তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি ব্যবহার করা হয়েছে। নির্মাতারা জানিয়েছেন, মাইকার পরিবারের অনুমতি নিয়ে তাঁরা এসব ব্যক্তিগত আর্কাইভ সংগ্রহ করেছেন।
তথ্যচিত্রটি মূলত পরিবার, বন্ধু ও মাইকা-জন-পলকে চেনা ব্যক্তিদের বক্তব্যের মাধ্যমে এগিয়েছে। জন-পল এতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
নির্মাতাদের ভাষায়, মাইকার গল্পে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি তাঁদের নাড়া দিয়েছে, তা হলো—নিজের কথা শোনানোর জন্য তিনি শেষ পর্যন্ত কতটা চেষ্টা করেছিলেন। সেই কণ্ঠ যেন হারিয়ে না যায়, সেটিই তথ্যচিত্রটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।