হোম > শিক্ষা > ক্যাম্পাস

ধারাবাহিক সাফল্য, শতভাগ জিপিএ-৫

নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমস

মো. সাইদুল ইসলাম, নরসিংদী

ছবি: সংগৃহীত

এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নরসিংদীর একটি স্কুল সবার নজর কেড়েছে। নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের ৩৮২ পরীক্ষার্থীর সবাই পেয়েছে জিপিএ-৫। অর্থাৎ, শতভাগ পাসের পাশাপাশি শতভাগ জিপিএ-৫। নরসিংদীর ভেলানগর জেলখানার মোড়সংলগ্ন এলাকায় স্কুলটির অবস্থান। ২০০৮ সালে থার্মেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির মোল্লা এটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্ত্রী নাছিমা কাদির মোল্লার নামে রাখা হয় বিদ্যালয়ের নাম। তাঁতশিল্পের জন্য পরিচিত নরসিংদী এবার শিক্ষার ফলেও উঠে এসেছে আলোচনায়। শহরের বাইরে থেকেও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব—নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের সাফল্য যেন তারই উদাহরণ।

ধারাবাহিক সাফল্য

নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের সাফল্যের গল্প নতুন নয়। ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৫ সালে ৩২০ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছিল। ২০২৪ সালে ২৯৪ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২৯৩ জন। ২০২৩ সালে ২৭৮ জনের মধ্যে ২৭০ জন এবং ২০২২ সালে ২৬৬ জনের সবাই পায় জিপিএ-৫।

এর আগে ২০২১ সালে ২৪৭ জনের মধ্যে ২৩৭ জন, ২০২০ সালে ২১৪ জনের মধ্যে ২০০ জন এবং ২০১৯ সালে ১৭১ জনের মধ্যে ১৬৮ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ১৩৯ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১৩৭ জন। ২০১৭ সালেও ছিল শতভাগ জিপিএ-৫। ওই বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬৪ জন শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ অর্জন করে। এবার ৩৮২ জনের সবাই জিপিএ-৫ পাওয়ায় সেই ধারাবাহিক সাফল্য আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

এই সফলতা সবার

এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী দ্বীপা মনি বলে, ‘এই সফলতা কারও একার নয়, এটি সবার। এখানে সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে আমাদের শিক্ষক, সহপাঠী ও অভিভাবকদের। তবে সবার প্রচেষ্টায় আমরা এই ফল অর্জন করতে পেরেছি।’

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া জাহান বলে, ‘শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে আমরা এত ভালো ফল করতে পেরেছি। পাশাপাশি শিক্ষকদের পরামর্শ শুনেছি।’

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মৌরী শিকদার লাবণ্য বলে, ‘আমাদের সিনিয়রদের এমন সাফল্যে শিক্ষার্থীদের নিয়মশৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম ও কনসিসট্যান্সি রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং অভিভাবকদের সহযোগিতারও বড় ভূমিকা রয়েছে।’

শৃঙ্খলাই সাফল্যের মূল চাবি

ভালো ফলের পেছনে স্কুলের নিয়মকানুনের কথাও বলছেন অভিভাবকেরা। এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার মেয়ের ফলে আমরা আনন্দিত। এখানে ভালো ফল করার কারণ এখানকার নিয়মকানুন খুবই সুন্দর। প্রতি ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য গাইড শিক্ষকেরা নিয়মিত খোঁজখবর নেন। আমাদের মেয়েরা বাড়িতে লেখাপড়া করছে কি না, সেটিও তাঁরা খোঁজ নেন; প্রয়োজনে বাড়িতে গিয়ে দেখেন।’

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের নির্দেশক্রমে দিন নেই, রাত নেই—কঠোর পরিশ্রম করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিনই আদায় করে নেওয়া হয়। যেন এক দিনের পড়া অন্যদিন জমে না থাকে।’

জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষিকা জাহিন শাহীন শেমা বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কীভাবে পড়বে, কী পড়বে—এসব বিষয়ে শিক্ষকরা নির্দেশনা দেন। এমনকি পরীক্ষার আগমুহূর্তে সিলেবাস কভার হয়েছে কি না, পড়া সম্পন্ন হয়েছে কি না—সবকিছুই শিক্ষকেরা তদারক করেন।’

ধারাবাহিক এই সাফল্যের পেছনে আছে নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের তদারকি, অভিভাবকদের সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের পরিশ্রম। নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের এবারের ফল সেই সম্মিলিত চেষ্টার ধারবাহিকতারই একটি উজ্জ্বল ছবি।

নরসিংদী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (মাধ্যমিক) এ এস এম আব্দুল খালেক বলেন, ‘নরসিংদী একটি অগ্রসরমাণ জেলা। আমি বিভিন্ন জেলায় শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। নরসিংদীতে শিক্ষার মান ভালো। নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমস যে ফল করছে, তা তাদের যোগ্যতার বলেই করছে বলে মনে করি।’

আব্দুল কাদির মোল্লা। ছবি: সংগৃহীত

নৌকা নিজস্ব গতিতে চলছে, আমি শুধু বইঠা ধরে রাখছি

আব্দুল কাদির মোল্লা

চেয়ারম্যান, নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমস

স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর আমার ইচ্ছা ছিল, এটিকে দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। ভালো ফলের পেছনে শুধু আমার কিংবা শিক্ষকদের অবদান নয়। এর সঙ্গে নরসিংদীবাসীরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁরাই আমাদের শিক্ষার্থীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা জুগিয়েছেন। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় থাকে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসার সময় আছে, যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় নেই। এই ফলের পেছনে রয়েছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সম্মিলিত অবদান। নৌকা তার নিজস্ব গতিতে চলছে, আমি শুধু বইঠা ধরে রাখছি। যতক্ষণ আমার সামর্থ্য এবং সুযোগ থাকবে, এই ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা করব। নরসিংদীবাসীকে এই ফল উৎসর্গ করলাম।

মফস্বল বা শহরতলি বলে শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো বিভাজন নেই। একজন শিক্ষার্থী যখন স্কুল বা কলেজজীবনে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনায় মগ্ন থাকে, তখন অন্যদিকে কোনো ডাইভারশন না থাকলে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে লেখাপড়া করলে যেকোনো জায়গা থেকে ভালো ফল করা সম্ভব।

আমি নিজেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য উৎসর্গ করেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোযোগ দেওয়ার অন্যতম কারণ হলো, আমাদের দেশের অনেক মানুষ অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষা নিতে পারে না। শুধু ঢাকা শহরেই মেধাবীরা থাকবে, এমন নয়। মফস্বলেও অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে। আমাদের স্কুলের মাধ্যমে তারা নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারবে।

সমালোচনা প্রসঙ্গে আব্দুর কাদির মোল্লা বলেন, ‘আমাদের নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা হয়, হবেই। যারা মানুষের কল্যাণে কাজ করে, তাঁরা সমালোচনার শিকার হবেই।

ইমন হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

প্রত্যেক ১২ শিক্ষার্থীর জন্য একজন গাইড

ইমন হোসেন, প্রধান শিক্ষক, নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমস

প্রতিটি স্কুলের কিছু নিজস্ব নীতি থাকে। আমাদের এখানে শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিতের চেষ্টা করা হয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক ১২ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন গাইড শিক্ষক। তাঁরা সার্বক্ষণিক শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর রাখেন। আমরা হোম ভিজিট করি, স্কুলের পড়া আদায় করি। এমনকি আফটার স্কুল, অর্থাৎ ছুটির পরও শিক্ষার্থীদের স্কুলে রেখে পড়া আদায় করি। ভালো শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের আমরা আলাদা পরিচর্যা করি। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিই। যারা অতি দুর্বল, তাদের স্কুলের হোস্টেলে নিয়ে আসি। আমাদের এই সাফল্যের শুরু ২০১২ সালে। তখন ২১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আমরা শুধু এ প্লাস ফলাফলে সন্তুষ্ট নই। আমাদের

এ প্লাস মানের মানুষ তৈরি করতে হবে। তারা যেন দেশের কাজে আসে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়, আমরা সেই মানের মানুষ চাই।