আনিকা সুবাহ আহমেদ উপমা রাজধানী ঢাকার মেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। এরপর হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব এডুকেশন থেকে অর্জন করেছেন দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। শিক্ষাজীবনে যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সহশিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রমে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব অ্যালবানিতে কর্মরত সহকারী পরিচালক হিসেবে। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আজকের পত্রিকার আনিসুল ইসলাম নাঈম।
আমার জন্ম ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে। বাবা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক ছিলেন। এখন অবসরে। মা একজন উদ্যোক্তা। ছোট ভাই পড়াশোনা করছে। আমি মা-বাবার আদরের সন্তান। আমার নামেই তাঁরা বাড়ির নাম রেখেছেন ‘উপমা কটেজ’। প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় পুরানা পল্টনের লিটল জুয়েলস স্কুলে। ছোট থেকে মিডিয়ার সঙ্গে পথচলা। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন টিভি বিজ্ঞাপন, নাটক ও মডেলিংয়ে অংশ নিই। এমনকি চলচ্চিত্র ও টেলিফিল্মেও কাজ করেছি। এর পাশাপাশি শিশু একাডেমি থেকে নজরুলগীতি শিখেছি, নাচ, আবৃত্তি, অভিনয়ও করেছি। ‘নতুন কুঁড়ি’র বেশ কয়েকটি পর্বে ফাইনালিস্ট ছিলাম।
তরুণদের নোবেল পুরস্কার বলা হয় ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডকে। এটি প্রিন্সেস ডায়ানার স্মৃতি এবং তরুণদের সামাজিক কাজের প্রতি তাঁর বিশ্বাসকে ধরে রাখতে যুক্তরাজ্য থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। আমি এই পুরস্কার পাই ২০২১ সালে। এ ছাড়া সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য একাধিক সম্মাননা পেয়েছি। শিক্ষকতার জন্য ২০১৬ সালে সাইফুরস প্রাইভেট লিমিটেডে ‘বেস্ট টিচার’ অ্যাওয়ার্ড, ২০১৭ সালে ‘ইয়ুথ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’, ২০২১ সালে ‘বিউটি উইথ ব্রেইন গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড’, ২০২২ সালে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ পাই। ‘টপ টেন ইনফ্লুয়েনশিয়াল উইমেন’ হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছি আমি। বাংলাদেশ উইমেন এন্ট্রারপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশনের স্বীকৃতিতে ‘বাংলাদেশের ১০ সাহসী নারী’র একজন হিসেবেও নির্বাচিত হই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকের পর অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুইস্টিকস ও ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি। এরপর কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ইংরেজি বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগ দিই। বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বেও ছিলাম। তবে আমার নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ছিল। সেই থেকে হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব এডুকেশনে আবেদন করি। আমার কর্ম অভিজ্ঞতা, একাডেমিক যোগ্যতা, ফলাফল এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম বিবেচনা করে বৃত্তি দেওয়া হয়। মোট শিক্ষাব্যয়ের ৪০ শতাংশ হার্ভার্ড এবং বাকি ৬০ শতাংশ একটি বহিরাগত সংস্থা থেকে বৃত্তি পেয়েছি। পুরো খরচই বৃত্তির আওতায় ছিল। ২০২২ সালে হার্ভার্ডে পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাই। সেখানে পড়তাম এডুকেশন লিডারশিপ, অর্গানাইজেশন অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ বিষয় নিয়ে। এই বিষয়ের অংশ হিসেবে হায়ার এডুকেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে বিশেষভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও সার্টিফায়েড হয়েছি। এটি ছিল আমার দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। শুধু হার্ভার্ডেই নয়, এমআইটিতেও পড়ার সুযোগ পেয়েছি। সেখান থেকে কিছু প্রাসঙ্গিক কোর্স করেছি।
আমি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউনিভার্সিটি অব অ্যালবানিতে) অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত। হার্ভার্ডে গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার আগেই এখান থেকে অফার লেটার পাই। নিয়োগপ্রক্রিয়াটি ছিল তিন ধাপের। প্রতিটি ধাপে সাক্ষাৎকারের পর শেষ পর্যন্ত আমাকে নির্বাচিত করা হয়। হার্ভার্ডে গ্র্যাজুয়েশনের দুই সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ শুরু করি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করাটা আমার ভালো লাগার বিষয়। সেটা শিক্ষকতা হোক বা প্রশাসনিক কাজের মাধ্যমে। এখানে মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন কোর্স নিতে হয়। তবে আমার মূল দায়িত্ব প্রশাসনিক। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও নানা বিষয় নিয়ে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করি। এখানে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ফ্যাকাল্টিদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়। মূলত আমেরিকার ক্যাম্পাস নিরাপত্তাবিষয়ক ফেডারেল আইন তদারকি করাই কাজের একটি বড় অংশ।
‘স্পিক ফর চেঞ্জ’ একটি জাতীয় পাবলিক স্পিকিং প্রতিযোগিতা, যা আমরা বাংলাদেশে শুরু করেছিলাম ‘ইভল্যুশন ৩৬০’ সংগঠনের ব্যানারে। ২০১৬ সালে সংগঠনটির যাত্রা শুরু। আর ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্পিক ফর চেঞ্জ’-এর প্রথম আসর। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন। প্রথম রাউন্ডে ক্যাটাগরি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট বিষয় দেওয়া হয়। যার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন এবং সেখান থেকে শর্টলিস্ট করে ফাইনালে নেওয়া হয়। ফাইনালে থাকে উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। সব ক্যাটাগরি মিলিয়ে ১০ জনকে পুরস্কৃত করা হয়। সনদ, মেডেল ও ট্রফির পাশাপাশি ‘ইভল্যুশন ৩৬০’ থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মেধাবৃত্তি দেওয়া হয়। ২০২১ সালের শেষ দিকে শুরু হয় ‘স্পিক ফর চেঞ্জ’-এর দ্বিতীয় আসর, যা মূলত তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। ‘ইভল্যুশন ৩৬০’ প্রতিনিয়ত ইয়ুথ স্কিল ডেভেলপমেন্টে নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ভলান্টিয়ারিজম, পাবলিক স্পিকিং কিংবা অন্যান্য দক্ষতা বৃদ্ধিতে আমরা চেষ্টা করি তরুণদের বিভিন্নভাবে প্রোডাকটিভ রাখতে। পাশাপাশি বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও অনলাইন ওয়েবিনারের আয়োজন থাকে।
২০১৭ সাল থেকে ‘ম্যানআপ ক্যাম্পেইন’-এ ইউএন প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত রয়েছি। আর ২০২৫ সালে ইউএন উইমেনের ‘সিএসডব্লিউ (কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেন) ইউথ অ্যাডভাইজরি মেম্বার’ হিসেবে নিয়োগ পাই। এখানে ভারত, পাকিস্তান, জার্মানি, নরওয়েসহ বিভিন্ন দেশের যুব প্রতিনিধিরা আছেন, যাঁদের মধ্যে আমিই একমাত্র বাংলাদেশি। জাতিসংঘের বিভিন্ন ইভেন্ট ও কনফারেন্সে আমাদের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। এখানে আমরা স্পিকার হিসেবে অংশ নিই। সবাই নিজ নিজ দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। জাতিসংঘের কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেন (সিএসডব্লিউ)-এর বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আমরা প্রোগ্রাম অর্গানাইজার হিসেবে কাজ করি। অনুষ্ঠানে কারা অংশ নেবেন, কোন মন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানানো হবে, প্রটোকল কী হবে—এসব বিষয় তদারক করতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন প্যানেলে নিজেরাও মডারেট ও অংশ নিই। তরুণদের এসব কনফারেন্সে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়াও আমাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষভাবে বাংলাদেশ থেকে যেন যথেষ্টসংখ্যক তরুণ কনফারেন্সে যোগ দিতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করার চেষ্টা করি। ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কেউ সশরীরে আসতে না পারলে তাঁদের অনলাইনে অংশগ্রহণের সুযোগও তৈরি করে দিই।
পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন, সব সময় মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চাই। বিশেষভাবে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আরও কিছু করার ইচ্ছা আছে। ভবিষ্যতে দেশের জন্য আরও ভালো কিছু করার স্বপ্ন রয়েছে।