আমি বেইজিংয়ে থাকি। আমার দুই মেয়ে। বড়টি দ্বিতীয় শ্রেণিতে, ছোটটি প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিন সকালে তাদের স্কুলে পৌঁছে দিই। প্রায়ই ভাবি, আজকের এই শিক্ষা তাদের ভবিষ্যতের জন্য কী নিয়ে আসতে পারে? এই দেশের জন্যই-বা কী দিতে পারে? সম্প্রতি চীনে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষাবিষয়ক একটি সম্মেলন হয়েছে। সেখানে তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—শিশুর স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রাথমিক শিক্ষার মান আরও উন্নত করা
এবং সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। আমি একজন সাধারণ চীনা মা। তবে প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে জানাতে চাই, কীভাবে একটি দেশ তার ভবিষ্যৎ নাগরিকদের গড়ে তোলে।
বোধ করি, বাংলাদেশের অনেকে জানতে চাইবেন: চীনের প্রাথমিক শিক্ষা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে। এ প্রসঙ্গে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে চীনে। এখানে রয়েছে প্রায় ৪৩ লাখ স্কুল, প্রায় ২২ কোটি শিক্ষার্থী এবং প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ শিক্ষক। ২০২৫ সালে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় নেট ভর্তির হার পৌঁছেছে ৯২ দশমিক ৯ শতাংশে। বাধ্যতামূলক শিক্ষায় ভর্তির হার ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিকে নেট ভর্তির হার ৯২ শতাংশ। দেশের ২ হাজার ৮৯৫টি জেলায় বাধ্যতামূলক শিক্ষার মৌলিক সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও গণিত এবং বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে চীনের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
তবে এসবের পেছনে রয়েছে কয়েক দশক ধরে শিক্ষা খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ। এবারের সম্মেলনে একটি বিষয় আমাকে অনেক বেশি স্পর্শ করেছে। সেটি হলো আগে প্রচলিত পরীক্ষার নম্বর ব্যবস্থাই ছিল শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। এখন বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্যই আগে।
আমার দুই মেয়েই এখন প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নেয়। সারা দেশে চালু হয়েছে ১৫ মিনিটের বাধ্যতামূলক ক্লাস বিরতি। একটি রাষ্ট্র যখন প্রতিটি শিশুর খেলাধুলা এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সময় বরাদ্দ করে, তখন বোঝা যায়, তারা শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতেরও যত্ন নিচ্ছে।
আরেকটি পরিবর্তন চোখে পড়ে শ্রেণিকক্ষে। আমার দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া মেয়ে এখন বিজ্ঞানভিত্তিক ছোট ছোট পরীক্ষা করে। প্রোগ্রামিং চিন্তার অনুশীলনও শেখে। বইয়ের উত্তর মুখস্থ করার বদলে এখন তাকে প্রশ্ন করতে শেখানো হয়। ভাবতে শেখানো হয়। নিজের মতো করে সমাধান খুঁজতে উৎসাহ দেওয়া হয়। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শুধু তথ্য জানাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিচারশক্তি, সৃজনশীলতা আর একসঙ্গে কাজ করার দক্ষতা।
শুধু মেধা নয়, চরিত্র গড়ার দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে স্কুলগুলো। শিশুরা ছোট সবজি বাগান করে। পালা করে শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে। নিজের কাজ নিজে করতে শেখে। ছোটবেলা থেকে তারা বুঝতে শেখে—শ্রম কোনো বোঝা নয়, সম্মানের বিষয়। এই ছোট ছোট অভ্যাসই একদিন দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করে।
আগে চীনকে বলা হতো বিশ্বের কারখানা। এখন সেই চীন ক্রমেই প্রযুক্তিতে শক্তিশালী দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে। আর এই উদ্ভাবনের বীজ বপন করা হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিতের ক্লাসগুলোতে। আবার শিক্ষার সমতা নিশ্চিত করতেও ব্যাপক উদ্যোগ নিচ্ছে রাষ্ট্র। প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের শিশুরাও এখন মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অনলাইনে দক্ষ শিক্ষকদের পাঠও তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। একটি দেশের উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকে পুরো জনগোষ্ঠীর শিক্ষার মানের ওপর। রাষ্ট্রীয় পরিষদের ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’ তাই বলছে—‘বস্তুতে বিনিয়োগ’ এবং ‘মানুষে বিনিয়োগ’—দুটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। ‘চতুর্দশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’ মেয়াদে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনকল্যাণমূলক ব্যয় প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে। গড়ে উঠছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষাব্যবস্থা। এটাই হলো একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে দূরদর্শী বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি।
বাংলাদেশও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের বড় চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে। দুই দেশের বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু একটি সত্য সবার জন্যই সমান—ভালো শিক্ষা মানুষের জীবন বদলায়, দেশের ভবিষ্যৎও বদলে দেয়। অবশ্য চীনের শিক্ষাব্যবস্থা নিখুঁত নয়। এখনো পরীক্ষার চাপ কমানো, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শহর-গ্রামের বৈষম্য কমানোর মতো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবু বিশ্বাস করি, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান হঠাৎ করে ঘটেনি। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল কয়েক প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষের হাতে।
প্রতিদিন বিকেলে স্কুল ছুটি হলে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। হাসিমুখে দৌড়ে বেরিয়ে আসে আমার দুই মেয়ে। তাদের ভিড়ে আমি শুধু নিজের সন্তানদের দেখি না। আমি দেখি ভবিষ্যতের প্রকৌশলী। শিক্ষক। চিকিৎসক। বিজ্ঞানী। কারিগর।
তারা সবাই হয়তো একদিন বিখ্যাত হবে না। কিন্তু তারা সবাই একটি যত্নশীল, ন্যায্য ও মানবিক প্রাথমিক শিক্ষার ভেতর দিয়ে বড় হচ্ছে। আর একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় বিনিয়োগ আর কী হতে পারে।
সূত্র: সিএমজি