সাক্ষাৎকার

শিক্ষার্থীবান্ধব গবেষণানির্ভর শিক্ষাঙ্গন গড়াই প্রধান লক্ষ্য: অধ্যাপক এস এম হেমায়েত জাহান

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) ১১তম উপাচার্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহান। ২০০৪ সালে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ২০২৪ সালে তিনি গ্রেড-১ অধ্যাপক হন। ২০১৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কেয়ংবুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পবিপ্রবির সার্বিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পটুয়াখালী প্রতিনিধি মীর মহিবুল্লাহ

প্রায় দেড় মাস হলো নিয়োগ পেয়েছেন। কী কী পরিবর্তন আনলেন?

আমার এই দেড় মাসে পবিপ্রবিকে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওয়ার্ল্ড র‍্যাঙ্কিংয়ে নিয়ে আসার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি, যা বর্তমানে দৃশ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬ বছর ধরে চলা অনিয়ম এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে অস্থিরতা ও হীনম্মন্যতা কাজ করছিল, তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। প্রতিটি শাখায় গিয়ে অফিসের সময় নিশ্চিত করেছি। শিক্ষকদের শিক্ষা ও গবেষণায় উজ্জীবিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে পরিকল্পনা ও প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে কৃষি, মাৎস্যবিজ্ঞান, ভেটেরিনারি, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আইন ও ভূমি প্রশাসন, প্রকৌশল, সমুদ্রবিজ্ঞানসহ মোট ১০টি অনুষদ চালু রয়েছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে নতুন বিভাগ ও অনুষদ চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। এর অংশ হিসেবে ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন, ফিজিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড স্পোর্টস এবং নার্সিং অ্যান্ড হেলথ সায়েন্স বিভাগের সমন্বয়ে নতুন হেলথ সায়েন্স অনুষদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮তম রিজেন্ট বোর্ড সভায় অনুমোদিত হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন পেলেই পরবর্তী প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে। অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্যের কথা চিন্তা করে বরিশাল ও পটুয়াখালীতে টিউশনি ও অন্যান্য কাজে নিয়মিত যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের বাসভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। পরিবহন, অর্থ ও হিসাব শাখায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতে নির্দেশ দিয়েছি। নতুন শিক্ষার্থীরা যাতে র‍্যাগিংমুক্ত ও শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে কাজ করছি।

একই সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিস্ট আমল থেকে বহিরাগতদের আনাগোনা এবং মাদকের যে আখড়া তৈরি হয়েছিল, তা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দমন করেছি। ক্যাম্পাসকে র‍্যাগিংমুক্ত করার বিভিন্ন কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই উপাচার্য পেল পবিপ্রবি। সবার সহযোগিতা কতটা পাচ্ছেন?

এককথায় বলব, আমাকে খুশিমনে গ্রহণ করেছে। আমি যে উদ্যোগগুলো নিয়েছি, সেগুলোর প্রতি সাড়া দিয়েছেন উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, প্রক্টরিয়াল বডি, অ্যাডভাইজরি বডি, প্রভোস্ট কাউন্সিল, সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই। তাঁদের সহযোগিতা শুধু অফিস সময়েই নয়, রাত ১২টা-১টা পর্যন্তও প্রশাসনিক বডিগুলো কাজ করছেন। আমিসহ বর্তমান প্রশাসনের চাওয়া হলো বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর শিক্ষা ও গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়া। তাঁরা বিষয়টি অনুধাবন করে সার্বিক সহযোগিতা করছেন। এটি প্রমাণ করে, পবিপ্রবি পরিবার আমাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছে।

আমি আশাবাদী, সবার সহযোগিতায় এ প্রতিষ্ঠানকে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’-এ পরিণত করতে পারব, ইনশা আল্লাহ।

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

দক্ষিণবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পবিপ্রবি। কৃষি গুচ্ছ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গুচ্ছ থেকে দুই দফায় শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাঁদের ক্লাস শুরু হয়েছে। এ ছাড়া এখানে অনেক মেধাবী শিক্ষক রয়েছেন এবং গবেষণার জন্য ভালো সুযোগ রয়েছে।

আমি দেশের বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিংয়ে নিয়ে আসার জন্য ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পর আমরা র‍্যাঙ্কিং উন্নত করার লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট আধুনিকায়ন, সর্বক্ষেত্রে অটোমেশন চালুসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পবিপ্রবির গবেষণার ফল সারা দেশসহ বিশ্বের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া আমার মূল লক্ষ্য। শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগারে শিক্ষা ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ অর্থায়ন।

বিদেশি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছি। গ্রামীণ পরিবেশে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ‘ইন্টারন্যাশনাল কোলাবরেশন ফর ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচার’ (আইসিএফএসএ), মালয়েশিয়ার একমাত্র বাংলাদেশি সদস্য। এতে বিশ্বের ১৫টি দেশের ২০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত রয়েছে।

সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার ইউনিভার্সিতাস নেগেরি পাদাংয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাইয়ের মাধ্যমে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছি। এভাবেই দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি।

কাজের অগ্রাধিকারে কী কী রয়েছে ?

প্রথম অগ্রাধিকার শিক্ষা ও গবেষণা। দ্বিতীয়টি নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা এবং যথাসময়ে ফল প্রকাশ। তৃতীয়ত, মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস গঠন। মাদক নিরোধের লক্ষ্যে আমরা প্রথমে ডোপ টেস্টের মাধ্যমে ভর্তি নিয়েছি। ভবিষ্যতে এটি শতভাগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।

চতুর্থত, র‍্যাগিংমুক্ত হলের পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধান করা।

পঞ্চমত, শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করা এবং তাঁদের উপযুক্তভাবে পুরস্কৃত করা। এ ছাড়া যারা ভালো কাজ করবে বা সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেবে, তাদেরও পুরস্কৃত করা হবে। এভাবেই পবিপ্রবিকে এগিয়ে নিতে চাই।

অতীতে অনেক অনিয়ম, অবৈধ নিয়োগ ও পদোন্নতি ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত হলেও প্রতিবেদন জমা হতো না। এ ব্যাপারে আপনার উদ্যোগ থাকবে কি না?

আমি রেজিস্ট্রার হওয়ার পরপরই তদন্ত কমিশন-২০২৪ গঠন করেছি। ওই কমিশনের মূল লক্ষ্য ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সব অনিয়মের তদন্ত করা এবং দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিয়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। ১৫ বছরের অনিয়মের কারণে শিক্ষার পরিবেশ ও প্রশাসনিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কিছুটা সময় লাগছে। তাই প্রতিবেদনগুলোতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটিগুলো বিভিন্ন উপকমিটি গঠন করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি, শিগগির এর ফল প্রকাশ পাবে। একই সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার জন্য সুপারিশ করা হবে।

ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তি হবে কি না?

ভর্তি পরীক্ষায় যে দুর্নীতি ঘটেছে, তার তদন্ত চলছে। গোয়েন্দা সংস্থাও তথ্য সংগ্রহ করছে। অনেক অগ্রগতি হয়েছে, যা কিছুদিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে। তবে গোপনীয়তার স্বার্থে এ বিষয়ে এখন বিস্তারিত কিছু বলা ঠিক হবে না।

থেমে থাকা নির্মাণকাজ দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেবেন?

আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেমে থাকা কাজগুলো চালুর লক্ষ্যে সব ঠিকাদার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কনস্ট্রাকশন কনসালট্যান্সি ফার্মের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছি। বর্তমানে নির্মাণকাজগুলো দ্রুত এগিয়ে চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে পরিকল্পনা ও প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য আমার প্রশাসনের সব পর্যায়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দিনরাত পরিশ্রম করছেন।

এ ছাড়া আমার কাছে নতুন করে কোনো প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ নেই। তবে কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। আমরা দুদককে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছি। এ ছাড়া সবার ওপর বর্তমান প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে।

আপনার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে পরামর্শ।

আমাদের জীবনে দুই ধরনের মাইন্ডসেট দেখা যায়, ফিক্সড মাইন্ডসেট ও গ্রোথ মাইন্ডসেট। ফিক্সড মাইন্ডসেট মানুষকে একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখে। আর গ্রোথ মাইন্ডসেট বা ইতিবাচক মানসিকতা বিশ্বাস করে, কঠোর পরিশ্রম, সঠিক পরিকল্পনা ও শেখার আগ্রহ দিয়ে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি জয় করা সম্ভব।