সাক্ষাৎকার

পৃথ্বী সাহার বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন জয়

ছোট্ট একটা মেয়ে। মা তখন তার কপালে হাত রেখে স্বপ্ন দেখতেন—এই মেয়ে একদিন জয় করবে পুরো পৃথিবী। সেই বিশ্বাসের ওপর আস্থা রেখেই নাম রাখা হয়েছিল পৃথ্বী। প্রায় দুই যুগ পর আজ সেই নামের অর্থ যেন সত্যি হয়ে উঠতে শুরু করেছে বাস্তবে। চুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টায় গবেষণাভিত্তিক স্নাতকোত্তরে পূর্ণ বৃত্তি পেয়েছেন পৃথ্বী সাহা। দীর্ঘ প্রস্তুতি, গবেষণার প্রতি নিরলস আগ্রহ আর অবিচল পরিশ্রম—এই তিনে মিলেই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে এই সাফল্যে। আগস্টের এক ঝলমলে দিনে তিনি পাড়ি জমাবেন নতুন স্বপ্নের দেশে, নতুন এক আকাশের নিচে। তাঁর সেই পথচলার গল্প শুনিয়েছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম

পৃথ্বী সাহা। চট্টগ্রামের মেয়ে। দুই বোনের মধ্যে বড়। বাবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার, মা বাংলাদেশ রেলওয়েতে সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট। দুজনই ব্যস্ত থাকতেন কর্মজীবনের ঘেরাটোপে, তাই মেয়েকে সময় দেওয়ার সুযোগ হতো না সব সময়। সেই ফাঁকা জায়গাটুকু ভরিয়ে দিয়েছিলেন দিদা-দাদু।

পৃথ্বীর শৈশবের বড় একটা অংশ কেটেছে তাঁদেরই আঁচলের ছায়ায়, তাঁদের হাত ধরে। স্নেহ আর শাসনের এক অদ্ভুত মিশেলে গড়ে উঠেছিল তার ছেলেবেলা। কখনো নরম আবদার, কখনো কড়া নিয়মের বেড়াজাল। আর সেই আঙিনাতেই তিনি শিখেছেন শৃঙ্খলার পাঠ, অধ্যবসায়ের মন্ত্র, আর মানুষকে শ্রদ্ধা করার প্রথম শিক্ষা।

পড়াশোনা

পৃথ্বীর পড়াশোনার হাতেখড়ি দিদা-দাদুর কাছে। বর্ণমালার প্রথম পাঠ যেন তাঁদেরই আঙুল ধরে। পঞ্চম শ্রেণিতে পা রেখে ভর্তি হন সেন্ট স্কলাস্টিকাস গার্লস হাইস্কুলে। সেখান থেকে জিপিএ-৫ ছুঁয়ে পার হন এসএসসির গণ্ডি। এরপর চট্টগ্রামের হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের আঙিনায় কেটেছে দুটি বছর। জিপিএ-৫ আর বৃত্তি— দুটোই সঙ্গী হয়ে আসে এইচএসসিতে। তারপর স্বপ্নের পরের ধাপ—চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জটিল সব সমীকরণ আর যন্ত্রকৌশলের পাঠে ডুবে থেকে ৩.৭৪ সিজিপিএ নিয়ে শেষ করেন স্নাতক।

সহশিক্ষায় পৃথ্বী

পৃথ্বীর বয়স তখন মোটে চার। সেই সময় থেকে সুরের সঙ্গে সখ্য। তাঁর দিদা নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যা গানের রেওয়াজ করাতেন। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াবস্থাতেই ‘মার্কস অলরাউন্ডার’ প্রতিযোগিতায় আবৃত্তিতে জেলা পর্যায়ে প্রথম হন। এরপর নিয়মিত নাটক, উপস্থাপনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন; পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার অর্জন করেন। স্কুল-কলেজ জীবনে রবীন্দ্রসংগীত, দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা আবৃত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে একাধিক পুরস্কার পান। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এসেও সেই ছাপ রেখেছেন পৃথ্বী। চুয়েটে বিতর্ক, সংস্কৃতি ও পেশাভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি একে একে অ্যাশরেই চুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট, চুয়েট চেস ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রোবো-মেকাট্রনিকস অ্যাসোসিয়েশনের সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট এবং চুয়েট কালচারাল ক্লাব ‘জয়ধ্বনি’-এর থিয়েটার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখান থেকে গড়ে ওঠে তাঁর নেতৃত্বের সাহস, দলগত কাজের বোঝাপড়া, আর মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার সেই বিরল দক্ষতা।

যেভাবে বৃত্তি

পৃথ্বীর স্বপ্ন ছিল বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার। তিনি বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ নিয়ে সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানে কাজ করতে চেয়েছেন; বিশেষ করে গবেষণার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ইচ্ছাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি নিজের আগের অর্জনকে ছাড়িয়ে নতুন সাফল্য গড়তে চান। চুয়েটে পড়াশোনার সময় থেকে তিনি একাডেমিক ও গবেষণার প্রোফাইল গড়ে তোলেন। পাশাপাশি বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং আবেদনপ্রক্রিয়া শুরু করেন। পরে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টায় আবেদন করেন। অফার লেটার পাওয়ার সময় তিনি শ্রীলঙ্কা সফরে ছিলেন। পৃথ্বী বলেন, ‘যদি প্রত্যাশিত ফল না আসে, তাহলে পুরো ভ্রমণের আনন্দই মাটি হয়ে যাবে। তাই ইচ্ছা করেই মেইল দেখিনি। সপ্তাহখানেক পর দেশে ফিরে অফার লেটারটি দেখি। তখন আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো ছিল না। বহুদিনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছি।’ তিনি ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক স্নাতকোত্তরে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর ক্লাস শুরু হবে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে। আগস্টের মাঝামাঝিতে তিনি কানাডায় পাড়ি জমাবেন। পৃথ্বীর এই পথচলা সহজ ছিল না।

তিনি বলেন, ‘আমার পুরো যাত্রাটাই ছিল রোমাঞ্চকর এবং প্রতীক্ষায় ভরা। কঠিন সময়ে বাবা-মা, ছোট বোন, দিদা, মামা, কাছের মানুষ ও বন্ধুরা সব সময় পাশে ছিলেন। তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, তাঁদের সমর্থনই আমাকে নিজের ওপর আস্থা হারাতে দেয়নি।’

পড়ার বিষয় কী

পৃথ্বী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে গবেষণার জন্য পূর্ণ বৃত্তি পেয়েছেন। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র হবে জ্বালানি ও টেকসই পরিবেশ। ভবিষ্যৎ গবেষণায় তিনি বদ্ধ কক্ষের বাতাসের মান উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নির্মাণব্যবস্থা নিয়ে কাজ করবেন। চুয়েটে পড়াশোনার সময় তিনি শিল্পবর্জ্য ব্যবহার করে কম খরচে, সহজলভ্য কাঁচামাল ও সাশ্রয়ী উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ব্যাটারির নেগেটিভ টার্মিনাল বা অ্যানোড তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করেছেন।

নতুনদের বিদেশে পড়তে

বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিতে হলে শুরু থেকে ভালো সিজিপিএ ধরে রাখতে হবে; পাশাপাশি স্নাতক পর্যায়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পৃথ্বী বলেন, ‘এই সেমিস্টার একটু উপভোগ করি, পরের সেমিস্টার থেকে সিরিয়াসলি পড়ব—এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আবার শুধু পড়াশোনাতে সীমাবদ্ধ থাকাও ঠিক নয়। জীবনের কোনো অভিজ্ঞতাই অমূল্য নয়। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে হবে এবং বিভাগীয় বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। এ ছাড়া ক্যাম্পাস জীবনের ছুটিগুলোতে নিজের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করলে তা ভবিষ্যতে অনেক কাজে আসে। শক্তিশালী সিভি, এসওপি, এলওআর এবং ভালো আইইএলটিএস স্কোরও বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’ তবে সবচেয়ে বড় পাথেয় সেই বিশ্বাসটুকু–যে বিশ্বাস নিয়ে একদিন এক মা তাঁর মেয়ের নাম রেখেছিলেন পৃথ্বী।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বন্যার্তদের পাশে নোবিপ্রবি

সবুজ উপহারে নবীনদের স্বাগত

ঢাবিতে শুরু হলো ‘জুলাই গ্রাফিতি’ পুনর্লিখন

জবিতে ক্লাসরুমে চলন্ত সিলিং ফ্যান খুলে পড়ল শিক্ষার্থীর ওপর

রাবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত রাকসু ও শিবির নেতাদের গ্রেপ্তার দাবি

ঢাবিতে মানবাধিকারবিষয়ক ২ দিনব্যাপী কর্মশালা শুরু

ঢাবির সিন্ডিকেট সভা ঘেরাও কর্মসূচি ডাকসুর

আজও প্রতি রাতে ছেলের গেঞ্জি বুকে জড়িয়ে ঘুমাই: শহীদ সাজিদের মা

জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হবে: ঢাবি উপাচার্য

ভাড়া বাড়িতে শিক্ষার পরিবেশ ও মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়: অধ্যাপক তাহমিনা আখতার