‘বাবা’—মাত্র দুটি অক্ষরের শব্দ। কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বিশাল এক আকাশ, অফুরন্ত ভালোবাসা, সীমাহীন ত্যাগ এবং অটুট নির্ভরতার গল্প। সন্তানের জীবনে বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি একজন পথপ্রদর্শক, নির্ভরযোগ্য বন্ধু এবং সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। প্রতিবছরের জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্ব বাবা দিবস পালিত হয়। এ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো হয়। এই বিশেষ দিনে শিক্ষার্থীরাও তাঁদের বাবার প্রতি জানাচ্ছেন গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
আফসানা আলম প্রীতি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র
আব্বুর সঙ্গে ছোটবেলার অসংখ্য মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তিনি যেহেতু দূরে থাকতেন, তাই সব সময় অপেক্ষা করতাম, কবে বাড়ি ফিরবেন। মনে আছে, দুরবিন নিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত তাকিয়ে থাকতাম, যদি তাঁকে দেখা যায়। আব্বু এলে কী যে আনন্দ হতো। তিনি আমাকে বেড়াতে নিয়ে যেতেন, ছোট ইচ্ছেগুলোও খুব যত্নে পূরণ করতেন। একবার খুব শখ হয়েছিল, আমাদের একটি টিভি থাকবে। আব্বুকে বলেছিলাম। কিছুদিন পর এক ঈদের সময় হঠাৎ তিনি একটি টিভি নিয়ে এলেন। আজও মনে আছে, আনন্দমেলা দেখব বলে কত রাত পর্যন্ত আব্বুর সঙ্গে অপেক্ষা করেছিলাম। এখন যখন মানুষ আমার পাবলিক স্পিকিংয়ের প্রশংসা করে, তখন ছোটবেলার একটি ঘটনার কথা খুব মনে পড়ে। এক বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে আব্বু আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ মাইকের সামনে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘কথা বলো।’ তখন আমি হয়তো দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কী বলব, আব্বু?’ তিনি খুব সহজভাবে বলেছিলেন, ‘বলো, তুমি তোমার দেশকে কেন ভালোবাস।’ তখন মনে হয়েছিল, এ তো খুব সহজ! হয়তো সেদিন থেকে মানুষের সামনে কথা বলার জড়তা কাটতে শুরু করেছিল। জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—সহমর্মিতা, সততা ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আমি আব্বুর কাছ থেকে শিখেছি। বাবা দিবসে আব্বুর প্রতি রইল গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা।
মো. আমিমুল এহসান খান, শিক্ষার্থী, টোকিও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জাপান
সারা জীবন যিনি নিজের সবটুকু সুখ-আহলাদ বিসর্জন দিয়ে লড়ে গেছেন, তিনি আমার আব্বু। আমাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার জন্য নিজের বর্তমানকে উৎসর্গ করেছেন তিনি। ছোটবেলায় আব্বুর সঙ্গে কাটানোর মতো সময় খুব কমই পেয়েছি। কারণ, তিনি খুব ভোরে অফিসে যেতেন। আর ঢাকার তীব্র যানজট পেরিয়ে যখন বাসায় ফিরতেন, তখন অনেক রাত হয়ে যেত। প্রতিদিনের এই ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের প্রতি তাঁর নিঃশব্দ ভালোবাসা, যত্ন আর আবদার পূরণের আন্তরিক চেষ্টা কখনো কমেনি। শৈশবের একটি স্মৃতি আজও স্পষ্ট হয়ে মনে ভাসে। তখন আমি খুব ছোট। লালশাক দিয়ে ভাত খেতে খুব ভালোবাসতাম। এক রাতে হঠাৎ লালশাক খাওয়ার ইচ্ছা হলো। তখন অনেক রাত। আমার মন খারাপ দেখে আব্বু ক্লান্ত শরীর নিয়ে আমাকে কোলে করে বাজারে নিয়ে গেলেন। আজও সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন প্রায় সব দোকানই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে অবশেষে তিনি দুই আঁটি লালশাক জোগাড় করলেন। এরপর বাড়ি ফিরে মা সেই শাক রান্না করে দিলেন, আর আমি আনন্দ নিয়ে ভাত খেলাম। আব্বুর সেই মমতা, ত্যাগ আর সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর অক্লান্ত চেষ্টা আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি। বাবা দিবসে তাঁর প্রতি রইল গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
শ্রাবণী ধর, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব কেরালা, ভারত
আজ এমন একটি দিন, যে দিনে সেই মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর সময়, যিনি নীরবে আমাদের জীবন গড়ে তোলেন। ‘কোনো চিন্তা করিস না মা, আমি তো আছি’—এই একটি বাক্য আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। এই কথার ভেতরে লুকিয়ে থাকে নিরাপত্তা, সাহস আর এগিয়ে যাওয়ার অদম্য শক্তি। আমার জীবনে বাবা একজন নীরব যোদ্ধা। তিনি প্রতিটি কাজে আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে জীবনে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ভেঙে না পড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাঁর কাছ থেকে আরও শিখেছি, মানিয়ে নেওয়া দুর্বলতা নয়, বরং শক্তির আরেক নাম। বাবার নিঃস্বার্থ ত্যাগ আর দায়িত্ববোধ আমাদের স্বপ্ন দেখতে, লড়তে এবং আবার উঠে দাঁড়াতে শেখায়। তিনি আছেন বলেই আমি নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে পারি। বাবা, তুমি আছো বলেই আমি আজকের আমি।
সামিহা হোসেন সারা, শিক্ষার্থী, ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ, উত্তরা
আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আমার জীবনের সেরা মানুষ কে? আমি নিঃসংকোচে উত্তর দেব, আমার আব্বু। আব্বুর একমাত্র রাজকন্যা আমি। তিনি আমাকে রাজকন্যার মতো করেই বড় করেছেন। স্কুলজীবন থেকে শুরু করে কলেজজীবন শেষ হওয়া পর্যন্ত আমার জামাকাপড় আয়রন করা, জুতায় কালি করাসহ সবকিছুই তিনি পরম মমতায় করে দিয়েছেন। আমার সব বোর্ড পরীক্ষায় আব্বুই ছিলেন আমার সঙ্গী। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি—সব পরীক্ষায় আব্বুই আমাকে নিয়ে যেতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে, শুধু মেয়ের পরীক্ষা শেষ হওয়ার জন্য। স্কুল-কলেজের বেতন বা কোনো কিছু নিয়েই কখনো আমাকে ঝামেলা পোহাতে হয়নি। সব আমার বাবা করে দিতেন।
২০১৫ সালে পড়াশোনার জন্য আমরা রাজধানী ঢাকায় চলে আসি। তখন আব্বুর ব্যবসা ছিল গ্রামে। আমাদের ভালো পড়াশোনা ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তিনি অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আম্মু আমাদের নিয়ে ঢাকায় থাকতেন বলে আব্বুকে সপ্তাহে তিন-চার দিন গ্রামের বাড়িতে একা থাকতে হতো। একাকী জীবনযাপনে তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কখনো রাতে ভাত না খেয়ে মুড়ি খেয়ে দিন কাটিয়েছেন, কখনো হোটেলে খেয়েছেন, আবার কখনো নিজেই কোনোমতে রান্না করে খেয়ে রাত পার করেছেন। কিন্তু তাঁর সেই কষ্টের কথা আমাদের কখনো বুঝতে দেননি।
আমরা যেন ভালোভাবে পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হতে পারি, এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আব্বুর প্রবল ইচ্ছাতেই আজ আমি ডাক্তার হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছি। তিনি সব সময় চেয়েছেন আমি একজন চিকিৎসক হই। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও ভালোবাসার ফলেই আজ আমি এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।
আমার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আব্বুই ছিলেন আমার অনুপ্রেরণা, আমার আদর্শ। অথচ তাঁকে কখনো বলা হয়নি, ‘আব্বু, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ আজ বলতে চাই—আব্বু, তুমি একজন শ্রেষ্ঠ বাবা। বাবা দিবসে সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার একটাই প্রার্থনা—তিনি যেন আমার বাবাকে সুস্থ রাখেন, নেক হায়াত দান করেন এবং তাঁর স্নেহছায়া আমাদের ওপর আজীবন অটুট রাখেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমাকে পাশে চাই আব্বু। তোমার দোয়ার হাত যেন সব সময় আমার মাথার ওপর থাকে।
অর্ণব দাশ, শিক্ষার্থী, চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত
বাবার প্রতি ভালোবাসা এমন এক অনুভূতি, যা অনেক সময় গভীর হলেও মুখে বলা হয়ে ওঠে না। ছোটবেলায় তাঁকে শাসনের প্রতীক মনে হলেও বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি, সেই শাসনের আড়ালে ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও দায়িত্ব বোধ। শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে—বাবার কাঁধে চড়া, আঙুল ধরে হাঁটা কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতি। পরিবার থেকে দূরে গেলে আরও বেশি উপলব্ধি হয়, বাবার উপস্থিতি কতটা নির্ভরতার ছিল। সন্তানের স্বপ্নপূরণে তিনি নীরবে পরিশ্রম করে চলেন, নিজের চাওয়া-পাওয়াকে পুরোপুরি বিসর্জন দেন। তাঁর এই নিঃশব্দ ত্যাগ, ভালোবাসা আর সংগ্রামই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়। তাই বাবা দিবস শুধু একটি দিনের আয়োজন নয়; বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা প্রকাশের প্রতিটি দিনই বাবা দিবস।
লিমা আক্তার, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার সবচেয়ে বড় গর্ব আমার বাবা। তিনি আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, নিজের সিদ্ধান্ত আমাকে নেওয়ার সাহস দিয়েছেন। কোনো ভুল করলে বকাবকি করেননি, বরং মমতায় পাশে দাঁড়িয়েছেন। আজ আমার জীবনের প্রতিটি অর্জনের পেছনে তাঁর অবদান জড়িয়ে আছে। চারপাশের মানুষের কথার চেয়ে তিনি সব সময় তাঁর মেয়ের বিশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কখনো আদরে আগলে রেখেছেন, কখনো নিজের কষ্ট আড়াল করে আমাদের জন্য শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে কাঁদতেও দেখেছি, আবার পাহাড়ের মতো আশ্রয় হয়েও থাকতে দেখেছি। বাবা, তোমাকে কখনো মুখে বলা হয়নি, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি সব সময় আমার জন্য দোয়া কোরো, যেন তোমার দেখানো স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারি। আর একটা কথা, তুমি ওষুধগুলো ঠিকমতো খেয়ো। আমার প্রতিটি অর্জনের পেছনে তোমার নামই লেখা থাকবে।
মুহিবুল হাসান রাফি, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ
আমার কাছে বাবা মানে ত্যাগ, ভালোবাসা আর নির্ভরতার এক বটবৃক্ষ। তিনি জীবনে পর্দার আড়ালে থাকা সেই নীরব এক চরিত্র, যিনি নিঃশব্দে আমাদের জীবন গড়ে তোলেন। শৈশবে আদর্শলিপি শেখার আগেই বাবার কণ্ঠে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘আমার পণ’ কবিতা শুনে জীবনের প্রথম নৈতিক পাঠ শুরু হয়েছিল। সৎভাবে বাঁচার চেষ্টা করা, সময়ানুবর্তিতা, অধ্যবসায়—সবকিছুর শিক্ষা আমি পেয়েছি বাবার কাছ থেকে।
সত্য আর ন্যায়ের পথে চলার জন্য তিনি সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। সারা জীবন নিজের ইচ্ছাগুলোকে বিসর্জন দিয়ে তিনি আমাদের মুখে হাসি ফোটাতে অবিরাম সংগ্রাম করেছেন। সংসারে টাকাপয়সার সীমাবদ্ধতা থাকলেও আমাদের আবদার পূরণ করতে তিনি কখনো পিছপা হননি। বারাক ওবামার কথার সুরে বললে, বাবার সবচেয়ে বড় উপহার ছিল আমার ওপর তাঁর অটুট বিশ্বাস। আজও বলা হয়ে ওঠেনি—বুকে জড়িয়ে বলি, তুমি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।
মাফরুজা আক্তার সুমি, শিক্ষার্থী, আকরামুননেছা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, নগরকান্দা
সন্তানের জীবনে বাবা যেন এক বিশাল বটবৃক্ষ। জীবনে নানা ধরনের ঝড়ঝাপটা, রোদ-বৃষ্টি আর অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকেন। নিজের কষ্ট, ক্লান্তি আর না পাওয়ার গল্পগুলো আড়াল করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। অনেক সময় বাবা মুখে ভালোবাসা প্রকাশ করেন না, কিন্তু তাঁর প্রতিটি ত্যাগ, সংগ্রাম ও দায়িত্ববোধ হলো সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ। বিশেষ করে একজন মেয়ের জীবনে বাবা আত্মবিশ্বাসের প্রথম পাঠশালা। তাঁর হাত ধরেই পৃথিবীকে চিনতে শেখা, স্বপ্ন দেখতে শেখা এবং এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাওয়া যায়। পৃথিবীর সব বাবার প্রতি রইল গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।